৮ শ্রাবণ ১৪২৫, সোমবার ২৩ জুলাই ২০১৮ , ১২:১২ অপরাহ্ণ

২২ রোজা : দেহের ওপর জুলুম আল্লাহর অপছন্দ


সিটি করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৯:০৯ পিএম, ৭ জুন ২০১৮ বৃহস্পতিবার | আপডেট: ০৩:০৯ পিএম, ৭ জুন ২০১৮ বৃহস্পতিবার


২২ রোজা : দেহের ওপর জুলুম আল্লাহর অপছন্দ

সংযম পালনের মাধ্যমে শুদ্ধতা অর্জনের মাস রমজানের ২২ তারিখ শুক্রবার। পবিত্র মাস শেষভাগে প্রবেশ করেছে। শুরু হয়েছে নাজাত বা জাহান্নামের আগুন থেকে নিষ্কৃতি লাভের দশক। সিয়াম সাধনার মাস যখন শেষ পর্যায়ে উপনীত হয়, ইমানদার মুসলমানরা হিসাব কষতে শুরু করেন রহমত ও মাগফিরাতের দশক কতটা কাজে লাগাতে পেরেছেন। এ সময়টুকুতে কতটুকু সওয়াব অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। বিগত দিনের রোজা কতটা আল্লাহ পাকের দরবারে কবুল হয়েছে।

বিশেষ কারণে যারা রোজা রাখতে পারেননি তারা `ফিদইয়া` হিসেবে গরিব-খাদ্যদানের মাধ্যমে তা পূরণের সচেষ্ট থাকেন। ইসলামে এ ব্যাপারে পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। হাদিসে এসেছে, ইসলামের বিধিবিধান অবগত হওয়া সত্ত্বেও কেউ যদি অসুস্থ অবস্থায় রোজা পালন করতে গিয়ে স্বাস্থ্যের ক্ষতিসাধন করেন, তাহলে তা সুস্পষ্টভাবে দেহ ও মনের ওপর জুলুম বা অত্যাচার করা হবে এটা আল্লাহতায়ালা অপছন্দ করেন। কোনো কোনো রুগ্ণ ব্যক্তির জন্য রোজা বা উপবাস খুবই স্বাস্থ্যহানিকর। সে ক্ষেত্রে উপবাসী হলে তার রোগ মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। এমতাবস্থায় রোজা থেকে তাকে সাময়িক অব্যাহতি দিয়ে ইসলামের সুস্পষ্ট নীতি মোতাবেক তার বিকল্প পদ্ধতির বিধান দেয়া হয়েছে। এজন্য রমজান মাসে অসুস্থতার কারণে কিংবা ভ্রমণরত অবস্থায় রোজা পালন করা কষ্টদায়ক হলে অন্য সময়ে অনুরূপসংখ্যক অর্থাৎ যে কটি রোজা পালন করা সম্ভব হয়নি, তা অবশ্যই পালন করার কথা বলা হয়েছে।

কিন্তু সে রোজা পালনও সম্ভবপর না হলে ফিদইয়া হিসেবে গরিব-মিসকিনকে খাদ্যদানের মাধ্যমে তা পূরণের সুযোগ রয়েছে। সম্ভব হলে অর্থাৎ কষ্টদায়ক না হলে রোজা পালন করাই বিশেষ কল্যাণকর।

ইবাদতের বিষয়ে শারীরিক সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে রুগ্ন ও প্রবাসী মুসাফিরের জন্য রোজার বিধান যথেষ্ট শিথিল করা হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রোজাদাররা যথাযথ খাবার গ্রহণ না করার কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তা ছাড়া অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ ও অপর্যাপ্ত ঘুম দেহকে বিপাকে ফেলে দেয়। তাই অসুস্থ এবং ভ্রমণরত ব্যক্তিদের রোজা পালন সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে সুস্পষ্ট ভাষায় ইরশাদ হয়েছে, `তোমাদের কেউ যদি অসুস্থ হয়ে যায় কিংবা কেউ যদি সফরে থাকে, সে ব্যক্তি সমপরিমাণ দিনের রোজা (সুস্থ হয়ে গেলে অথবা সফর থেকে ফিরে এলে) পরে আদায় করে নেবে। এরপর যাদের জন্য রোজা রাখা একান্ত কষ্টকর ব্যাপার বলে মনে হবে, তারা এর পরিবর্তে একজন মিসকিনকে খাদ্য দান করবে। যে ব্যক্তি খুশির সঙ্গে সৎকর্ম করে, তার জন্য তা কল্যাণকর হয়। আর যদি রোজা রাখ তবে তা তোমাদের জন্য বিশেষ কল্যাণকর, যদি তোমরা তা বুঝতে পার।` (সূরা আল-বাকারা, আয়াত-১৮৪)

রমজান মাসে গর্ভবতী মহিলা এবং দুগ্ধপোষ্য শিশুর মায়েদের জন্য রোজা পালন বাধ্যতামূলক নয়। আল্লাহতাআলা গর্ভজাত ও নবজাত শিশুসহ মায়েদের সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণের জন্য মাহে রমজানে রোজা পালনের কড়াকড়ি শিথিল করেছেন। সুস্থ হলে বা সক্ষমতা অর্জন করলে পরবর্তী সময়ে অবশ্যই এ রোজা পূর্ণ করতে হবে। যেসব মা শিশুদের বুকের দুধ খাওয়ান, তারা রোজা রাখলে দুধের পরিমাণ কমে যায় বলে শিশু পর্যাপ্ত দুধ পায় না। অন্যদিকে গর্ভবতী নারীরা রোজা রাখলে কষ্ট হওয়া ছাড়াও গর্ভজাত সন্তানের প্রয়োজনীয় পুষ্টিপ্রাপ্তি, শারীরিক গঠন ও বয়োবৃদ্ধিতে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। তাই যে নবজাতকের মা শিশুকে দুধ পান করান, তার জন্য রোজা পালন করার বাধ্যবাধকতা পর্যন্ত শিথিল করে দেয়া হয়েছে।

নবী করিম (সা.) বলেছেন, `আল্লাহ মুসাফিরের ওপর থেকে চার রাকাতবিশিষ্ট নামাজের অর্ধেক রহিত করে দিয়েছেন এবং মুসাফির, স্তন্যদানকারিণী ও গর্ভবতী মহিলা থেকে মাহে রমজানের রোজা পালন করার বাধ্যবাধকতাও শিথিল করে দিয়েছেন।` (তিরমিজি, আবু দাউদ ও নাসাঈ)

তবে বিনাওজরে কেউ যাতে রমজানের রোজা না ভাঙে সে ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.) মুসলমানদের সতর্ক করে বলেছেন, `যে ব্যক্তি মাহে রমজানের একদিনের রোজা কোনো (শরিয়ত অনুমোদিত) ওজর বা অসুস্থতা ব্যতীত ভঙ্গ করবে, সারা জীবনের রোজাও এর ক্ষতিপূরণ হবে না, যদি সে সারাজীবনও রোজা রাখে।` (তিরমিজি, আবু দাউদ ও মুসনাদে আহমাদ)

মুসাফির বা ভ্রমণরত ব্যক্তি বলতে পবিত্র কোরআনের তাফসিরকারক এবং শরিয়তের পরিভাষাবিদরা ব্যাখ্যা করেছেন যে ওই ব্যক্তি, যিনি সফরে আছেন। প্রবাসে থাকলে বা শুধু বাড়ি থেকে বেরিয়ে কোথাও গেলেই কেউ মুসাফির হন না। তার নির্দিষ্ট নিয়ত, নির্দিষ্ট দূরত্বে গমন এবং অবস্থানের কথা বলা হয়েছে। এতে কিছু শর্তও আরোপ করা হয়েছে। প্রথম শর্ত হলো, সফর দীর্ঘ হতে হবে। নবী করিম (সা.)-এর হাদিস এবং সাহাবায়ে কিরামের অনুসরণের ওপর ভিত্তি করে হজরত ইমাম আবু হানিফা (র.) এবং অন্যান্য ফিকহবিদ সফরের দূরত্বকে তিন মনজিল বলে অভিমত প্রকাশ করেন। অর্থাৎ একজন ব্যক্তি স্বাভাবিকভাবে হেঁটে তিনদিনে যতটুকু দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে, ততটুকু দূরত্বকে বোঝায়। পরবর্তীকালের ফিকহবিদরা এ দূরত্বকে ৪৮ মাইল সাব্যস্ত করেন।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিস অনুযায়ী সফরের সময়সীমা বলতে সফরকালীন এবং মধ্যবর্তী যাত্রাবিরতির মেয়াদ ঊর্ধ্বপক্ষে ১৫ দিনের কম সময়কে বোঝায়। কেউ যদি ভ্রমণের মধ্যেই কোথাও ১৫ দিন অবস্থান করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তখন সেটা আর সফরের মধ্যে বিবেচিত হবে না। সফরের দূরত্ব ও অবস্থানের মেয়াদ বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করলে দেখা যায় বিজ্ঞানের বদৌলতে এখন স্বল্প সময়ে প্রায় বিনা ক্লেশে অনেক দূরের পথ অতিক্রম করা সম্ভব এবং অবস্থানস্থল অধিকাংশ ক্ষেত্রে অতীতের মুসাফিরের ন্যায় নয়। রোজা পালনের ক্ষেত্রে অতীতে যেসব প্রেক্ষাপটে বিশেষ বিবেচনায় প্রযোজ্য ছিল আধুনিককালে তা অবস্থা অনুযায়ীই প্রযোজ্য হবে। যে সফর কঠিন বিপজ্জনক, সমস্যাসংকুল এবং রোজা পালনের জন্য অনুকূল নয়, সে সফরের দূরত্ব ও সময়সীমা ওই আলোকেই বিবেচিত হবে।

রমজান মাসে রোজা না রাখার জন্য অনেকেই বিভিন্ন অজুহাত খোঁজেন। অথচ সামান্য অসুস্থতা তো দূরে থাক, অনেক দীর্ঘস্থায়ী নিয়ন্ত্রণযোগ্য রোগেও রোজা রাখার ব্যাপারে কোনো বিধিনিষেধ নেই। আর সুস্থ অবস্থায় রোজা রাখা যে শরীরের জন্য উপকারী, তা বলাই বাহুল্য। আল্লাহর সন্তুষ্টি ও অনুগ্রহ অর্জনের জন্য তার দেয়া ফরজ বিধান রোজা পালন সৌভাগ্যেরই বিষয়।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

ধর্ম -এর সর্বশেষ