৮ শ্রাবণ ১৪২৫, সোমবার ২৩ জুলাই ২০১৮ , ১২:০৯ অপরাহ্ণ

২৩ রোজা : দারিদ্র্য বিমোচনে জাকাতের গুরুত্ব


সিটি করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৯:০১ পিএম, ৮ জুন ২০১৮ শুক্রবার | আপডেট: ০৩:০১ পিএম, ৮ জুন ২০১৮ শুক্রবার


২৩ রোজা : দারিদ্র্য বিমোচনে জাকাতের গুরুত্ব

ইসলামী সমাজ ব্যবস্থায় দারিদ্র্য বিমোচনে জাকাতের গুরুত্ব সর্বাধিক। কেননা ধর্মীয় এ বিধানে ধনীদের সম্পদের নির্দিষ্ট অংশ দরিদ্রের মাঝে বণ্টন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। যা দারিদ্র্য বিমোচনে চূড়ান্ত ভূমিকা পালনে অত্যন্ত সহায়ক।

তাই ইসলামে বিত্তশালীর সম্পদের নির্ধারিত অংশ দরিদ্র ও অভাবগ্রস্তদের হক হিসেবে পরিশোধ করার কঠিন নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আল-কুরআনে বারংবার নামায কায়েমের পরেই জাকাত আদায়ের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বার বার বলা হয়েছে- `সালাত কায়েম কর এবং জাকাত আদায় কর।` (সূরা আল-বাকারা: ৪৩, ৮৩, ১১০ ও ২৭৭ আয়াত; সূরা আন-নিসা ৭৭ ও ১৬২ আয়াত; সূরা আন নুর: ৫৬ আয়াত; সূরা আল-আহযাব ৩৩ আয়াত, সূরা মুয্?যামম্মিল: ২০ আয়াত)

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আরো বলেন, `তাদের অর্থসম্পদ থেকে জাকাত উসুল কর যা তাদের পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করবে।` (সূরা আত-তাওবা: ১০৩ আয়াত)। `মুশরিকদের জন্য রয়েছে ধ্বংস, তারা জাকাত দেয় না।` (সূরা হামীম: ৬-৭ আয়াত)। `আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তোমরা যে জাকাত দাও মূলত তা জাকাত দানকারীরই সম্পদ বৃদ্ধি করে।` (সূরা আররুম: ৩৯ আয়াত)

কোরআনুল কারিমে সুস্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে, জাকাতের বিধান বাদ দিয়ে পূর্ণাঙ্গভাবে ইসলাম মানা সম্ভব নয়। আর পূর্ণ মুমিন হওয়ার জন্য ইসলামের যাবতীয় বিধান মানা আবশ্যক। আল্লাহ তায়ালা বলেন, `তোমরা কি কিতাবের কিছু অংশে ঈমান রাখ আর কিছু অংশ অস্বীকার কর? সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারা তা করে, দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ব্যতীত তাদের কি প্রতিদান হতে পারে? কিয়ামত দিবসে তাদেরকে কঠিনতম আযাবে নিক্ষেপ করা হবে। আর তোমরা যা কর, আল্লাহ সে সম্পর্কে উদাসীন নন` (সূরা বাক্বারাহ : ৮৫)।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, জাকাত জান্নাত লাভের অন্যতম মাধ্যম। `জান্নাতের মধ্যে এমন সব (মসৃণ) ঘর রয়েছে যার বাইরের জিনিসসমূহ ভেতর হতে এবং ভেতরের জিনিসসমূহ বাইর হতে দেখা যায়। সেসব ঘরসমূহ আল্লাহ তায়ালা সেই ব্যক্তির জন্য প্রস্তুত করে রেখেছেন যে ব্যক্তি (মানুষের সঙ্গে) নম্রতার সঙ্গে কথা বলে, ক্ষুধার্তকে খাদ্য দান করে (জাকাত আদায় করে), পর পর সিয়াম পালন করে এবং রাতে সালাত আদায় করে অথচ মানুষ তখন ঘুমিয়ে থাকে`।

নবী করিম (সা.) আরো বলেন, `আল্লাহ তায়ালা তাদের ওপর তাদের সম্পদের মধ্য থেকে সাদাকা (জাকাত) ফরজ করেছেন। যেটা ধনীদের নিকট থেকে গৃহীত হবে আর দরিদ্রের মাঝে বণ্টন হবে`।

ধনীদের সম্পদের নির্দিষ্ট অংশ গরিবদের মাঝে বণ্টনের মাধ্যমেই কেবল দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব। সুদভিত্তিক অর্থনীতি কখনোই দারিদ্র্য দূর করতে পারে না। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ঋণের দোহাই দিয়ে যে দেশে যত সুদভিত্তিক অর্থনীতি চলছে সে দেশে তত দরিদ্রের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এ সম্পর্কে কোরআনে এসেছে, `আল্লাহ সুদকে ধ্বংস করেন এবং দানকে বর্ধিত করেন। আল্লাহ কোনো অকৃতজ্ঞ পাপীকে ভালোবাসেন না` (সূরা বাকারা : ২৭৬)। অতএব জাকাত আদায় করলে এবং দান করলে সম্পদ কমে যায় না। বরং তা বৃদ্ধি পায়। যে কোনো মাধ্যমে আল্লাহ তার রিযিক বৃদ্ধি করে দেন।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, `দান সম্পদ কমায় না; ক্ষমা দ্বারা আল্লাহ কোনো বান্দার সম্মান বৃদ্ধি ছাড়া হ্রাস করেন না এবং যে কেউ আল্লাহর ওয়াস্তে বিনয় প্রকাশ করে, আল্লাহ তাকে উন্নত করেন`

কেউ যদি জাকাত ওয়াজিব হওয়াকে অস্বীকার করে তাহলে সে মুরতাদ হয়ে যাবে। কেননা কোরআন ও সন্নাহ দ্বারা জাকাত ওয়াজিব সাব্যস্ত হয়েছে। পক্ষান্তরে কেউ যদি জাকাত ওয়াজিব হওয়াকে স্বীকার করে কিন্তু অজ্ঞতাবশত অথবা কৃপণতার কারণে জাকাত আদায় না করে তাহলে সে কাবীরা গুনাহগার হবে। তবে ইসলাম থেকে বের হবে না।

রাসূলুল্লাহ (সা.) জাকাত ত্যাগকারী সম্পর্কে বলেন, `অতঃপর তাকে তার পথ দেখানো হবে জান্নাতের দিকে, না হয় জাহান্নামের দিকে`। অতএব কৃপণতাবশত জাকাত ত্যাগকারী কাফির হলে তার জান্নাতের কোনো পথ থাকবে না। তবে তার থেকে জোরপূর্বক জাকাত আদায় করতে হবে। এক্ষেত্রে জাকাত আদায় করতে অস্বীকার করলে সে মুরতাদ হয়ে যাবে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, `কিন্তু যদি তারা তওবা করে, সালাত কায়েম করে ও জাকাত আদায় করে, তবে তাদের পথ ছেড়ে দেবে; নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু` (সূরা আত-তওবা : ৫)।

আবু বকর (রা) জাকাত আদায়ে অস্বীকারকারীদের সম্পর্কে বলেছিলেন, `আল্লাহর কসম! যদি তারা একটি মেষ শাবক জাকাত দিতেও অস্বীকৃতি জানায় যা আল্লাহ রাসূল (সা.)-এর কাছে তারা দিত, তাহলে জাকাত না দেয়ার কারণে তাদের বিরুদ্ধে আমি অবশ্যই যুদ্ধ করব`।

জাকাত পরিত্যাগকারীর পরিণাম উল্লেখ করে আল্লাহ তায়ালা বলেন, `যারা স্বর্ণ ও রৌপ্য পুঞ্জীভূত করে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় না করে তাদেরকে মর্মন্তুদ শাস্তির সংবাদ দাও। যেদিন জাহান্নামের অগ্নিতে তা উত্তপ্ত করা হবে এবং তা দ্বারা তাদের ললাট, পার্শ্বদেশ ও পৃষ্ঠদেশে দাগ দেয়া হবে। আর বলা হবে, এটাই তা, যা তোমরা নিজেদের জন্য পুঞ্জীভূত করতে। সুতরাং তোমরা যা পুঞ্জীভূত করেছিলে তা আস্বাদন কর` (সূরা আত-তওবা : ৩৪-৩৫)।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, `যাকে আল্লাহ সম্পদ দান করেছেন, কিন্তু সে এর জাকাত আদায় করেনি, কিয়ামতের দিন তার সম্পদকে টেকো (বিষের তীব্রতার কারণে) মাথাবিশিষ্ট বিষধর সাপের আকৃতি দান করে তার গলায় ঝুলিয়ে দেয়া হবে। সাপটি তার মুখের দু`পাশ্র্বে কামড়ে ধরে বলবে, `আমি তোমার সম্পদ, আমি তোমার জমাকৃত মাল।`

হাদিসে এসেছে জাকাত ত্যাগকারীরা শুধু আখিরাতেই নয়থ পৃথিবীতেও শাস্তির মুখোমুখি হবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, `যে জাতি জাকাত দেয় না, আল্লাহ তাদের ওপর বৃষ্টিপাত বন্ধ করে দেন`।

সারাবছর জাকাত আদায়ের সুযোগ থাকলেও রমজানের শেষ সময়ে এসে অধিকাংশ বিত্তশালী মুসলমান জাকাত আদায় করবেন। কেননা রমজানে আদায়কৃত জাকাতের সওয়াব ৭০ গুণ। জাকাত আদায় রমজানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট না হলেও সত্তর গুণ বেশি সওয়াব পাওয়ার আশায় বিপুলসংখ্যক বিত্তবান মুসলমান এ মাসটিকে জাকাত আদায়ের জন্য বেছে নেন। এতে সিয়াম সাধনার সঙ্গে আরেক মাত্রা যোগ হয়। অভাবী ও দুস্থ মানুষের প্রতি সমবেদনা প্রকাশের মাধ্যমে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সমপ্রীতির খোদায়ী বিধান পালনের সুযোগ তৈরি হয়।

যে সমস্ত সম্পদের জাকাত দিতে হবে, তা চার শ্রেণির। এক. স্বর্ণ বা রৌপ্য। দুই. ফসল ও ফল। তিন. ব্যবসায়ী অর্জন। চার. জমিন থেকে যা বের হয়। যেমন: খনি, ইত্যাদি। এর মধ্যে স্বর্ণ ও রৌপ্যের জাকাতের পরিমাণ হচ্ছে, যদি কারো কাছে ৫৯৫ গ্রাম রৌপ্য বা ৮৫ গ্রাম স্বর্ণ থাকে, তবে তাকে তার জন্য জাকাত দিতে হবে। তখন ওই অলঙ্কারে আড়াই শতাংশ হারে জাকাত দিতে হবে। ফসল ও ফলের জাকাতের ব্যাপারে সঠিক মত হচ্ছে, তা যদি ৬৫৩ কেজি (৩০০ সা`) হয় বা তার বেশি হয়, তবে তাতে জাকাত দিতে হবে। তারপর যদি ফসল বা ফল এমন হয় যে, তাতে নিজস্ব খরচে পানি বা সেচ করতে হয়, তবে উৎপন্ন দ্রব্যের ২০ ভাগের এক ভাগ দিতে হবে। আর যদি নিজস্ব খরচে পানি দিতে না হয়, তবে তাতে ১০ ভাগের ১ ভাগ জাকাত হিসেবে দিতে হবে।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

ধর্ম -এর সর্বশেষ