শেষ হচ্ছে রোজা : আল্লাহর নিবিড় সান্নিধ্য লাভ

সিটি করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৮:৪৩ পিএম, ১২ জুন ২০১৮ মঙ্গলবার



শেষ হচ্ছে রোজা : আল্লাহর নিবিড় সান্নিধ্য লাভ

মাহে রমজানের রহমত, বরকত, মাগফিরাত ও নাজাতের বারতা নিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে এমন একটি মহার্ঘ রাতের কথাও ঘোষণা করেছে, সে রাতে মানুষের ভূত-ভবিষ্যৎ ও পাপ-পুণ্যের সমন্বয় সাধন করা হয়। তাই এ মহিমান্বিত রাতের সুফল অর্জনের জন্য রোজাদারগণ রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফে শামিল হয়।

ইতিকাফের ফলে আল্লাহ তায়ালার সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় হয় এবং আল্লাহ তায়ালার জন্য মস্তক অবনত করার প্রকৃত চিত্র ফুটে ওঠে। কেননা আল্লাহ তায়ালা বলেন: আমি মানুষ এবং জিন জাতিকে একমাত্র আমারই ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছি। [সুরা আজ-জারিয়াত: ৫৬]।

আর এ ইবাদতের বিবিধ প্রতিফলন ঘটে ইতিকাফ অবস্থায়। কেননা ইতিকাফ অবস্থায় একজন মানুষ নিজেকে পুরোপুরি আল্লাহর ইবাদতের সীমানায় বেঁধে নেয় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির কামনায় ব্যাকুল হয়ে পড়ে। আল্লাহ তায়ালাও তার বান্দাদের নিরাশ করেন না, বরং তিনি বান্দাদের নিরাশ হতে নিষেধ করে বলেছেন: বলুন, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হইও না। নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গুনা মাফ করে দেন। তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। [সুরা ঝুমার : ৫৩]

ইতিকাফ সম্পর্কে কোরআনুল কারিমে এরশাদ হয়েছে, `আর যতক্ষণ তোমরা ইতিকাফ অবস্থায় মসজিদে অবস্থান কর, ততক্ষণ পর্যন্ত স্ত্রীদের সঙ্গে মিশ না। এ হলো আল্লাহ কর্তৃক বেঁধে দেয়া সীমানা। (সূরা : আল-বাক্কারা-১৮৭)।

এ পবিত্র আয়াতের মর্মার্থেই ইতিকাফ সম্পর্কে অবগত হওয়া যায়। বিশেষভাবে শবেকদরের পূর্ণ সওয়াব আয়ত্ত করার জন্য রমজান শরিফের শেষ দশকে নিয়ত সহকারে মসজিদে অবস্থান করাকে ইতিকাফ বলে। ইতিকাফের শাব্দিক অর্থ কোনো এক স্থানে অবস্থান করা। কোরআন-সুন্নার পরিভাষায় কতগুলো বিশেষ শর্ত সাপেক্ষে একটি নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে নির্দিষ্ট মসজিদে অবস্থান করাকে ইতিকাফ বলে। ইতিকাফের সময় পানাহারের হুকুম সাধারণ রোজাদারদের প্রতি নির্দেশেরই অনুরূপ। তবে স্ত্রী সহবাসের ব্যাপারে এ অবস্থায় পৃথক নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছে যে, ইতিকাফ অবস্থায় এটা জায়েজ নয়। উপরোক্ত আয়াতে এ কথারই প্রতিধ্বনি শ্রুতিগোচর হয়।

রাসুল বলেন, `আমি বেশ কয়েকবার ইতিকাফে বসি, সে সময় আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে প্রার্থনা করি- হে আল্লাহ আমি আপনার মেহমান হিসেবে সর্বশ্রেষ্ঠ মাসের এবং মহিমান্বিত রাত শবেকদরের অপরিমিত সওয়াব লাভের প্রত্যাশায় আপনার ঘর মসজিদে অবস্থান নিলাম। হে অসীম করুণাময় মহাদয়ালু আল্লাহ আপনি আমার কাংখিত কামনা-বাসনা পূরণ করে দিয়ে ইহকাল ও পরকালের যাবতীয় অঙ্গীকার কল্যাণকর ও মঙ্গলময় করে দেবেন বলে আশা পোষণ করছি। সেহেতু আপনার নিবিড় সঙ্গ লাভের আশায় মুক্তির দশকে আপনার ৯৯গুণ দয়া প্রাপ্তি কামনা করছি। হে রহমানের রাহিম, আমার আনুগত্য, আর্তি ও প্রার্থনা মঞ্জুর করে নিন।`

হাদিসে এসেছে, পরম করুণাময় আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে ইতিকাফ অত্যন্ত পছন্দনীয় ইবাদত। আর এ ইবাদত দ্বারাই মহান আল্লাহর সান্নিধ্য নিবিড়ভাবে লাভ করা যায়। আবার আল্লাহ রাব্বুল আলামিনও ইতিকাফকারীকে ভালোবাসেন। পবিত্র হাদিস শরিফে ও ইতিকাফ এবং ইতিকাফকারীর অপরিমিত উপকারিতা বর্ণিত হয়েছে।

নবী করিম (সা.) রমজানের শেষ ভাগে ইতিকাফ করতেন। তিনি সারাজীবনে মাত্র একবার তা কাজা করেছিলেন। সেটাও শাওয়াল মাসে আদায় করছিলেন। হুজুর পাক (সা.) কয়েকবার রমজানের প্রথমভাগেও ইতিকাফ করেছিলেন। কিন্তু তার ওফাতের সময় নিকটবর্তী হয়, তখন তিনি রমজানের শেষদিকে ইতিকাফে বসেন। তবে প্রায়ই তিনি রমজানের শেষ ১০ দিন ইতিকাফে বসতেন। আলোচ্য লেখনীতে ইতিকাফবিষয়ক কয়েকটি হাদিসে রাসুল উল্লেখ করা হয়।

হজরত আয়েশা ছিদ্দিকা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হুজুর পাক (সা.) রমজানের শেষ দশদিন ইতিকাফ করতেন এবং তার সঙ্গী সাথীগণ, সবাই তার সঙ্গে ইতিকাফ করতেন। (বোখারি, মুসলিম)

হজরত আবু হোরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলে করিম (সা.) প্রতি বছর একবার কোরআন মজিদ খতম করতেন। যে বছর তিনি প্রথমে ইতিকাফ করেন। সে বছর তিনি ২ খতম কোরআন মজিদ তেলাওয়াত করেন। তিনি বছরে রমজানের শেষ ১০ তারিখ ইতিকাফ করতেন। কিন্তু যে বছর তিনি ইন্তেকাল করেন, সে বছর ২০ দিন ইতিকাফ করেছিলেন। (বোখারি, মুসলিম)

রাসুলে খোদা (সা.) ইতিকাফকারী সম্পর্কে এরশাদ করেছেন, ইতিকাফকারী সমুদয় গুনা থেকে মুক্ত থাকে এবং সে পুণ্যবানদের সঙ্গে সঙ্গে পুণ্যের কাজেও শরিক থাকে। (ইবনে মাজাহ)

হজরত আয়েশা ছিদ্দিকা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করিম (সা.) এরশাদ করেছেন, তোমরা রমজানের শেষ ১০ তারিখে বেজোড় রাতে শবেকদর তালাশ করবে। (বোখারি)

হজরত আলী ইবনে আবু তালেব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলে খোদা (সা.) এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি রমজানের শেষ ১০ দিন ইতিকাফ করবে, সে দুটি নফল হজ ও দুটি নফল ওমরার সওয়াবের অংশীদার হবে। (বায়হাকি)

আল হাদিসে আরো এরশাদ হচ্ছে, যে ব্যক্তি খালেছ নিয়তে এবং দৃঢ় ইমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় ইতিকাফ করবে, তার আগের সমস্ত (ছগিরা) গুনা মাফ করে দেয়া হবে। (দায়লামি)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, `যে ব্যক্তি একদিন ইতিকাফে বসবে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কেয়ামতের দিন তার মধ্যে এবং দোজখের মধ্যে তিন খন্দকের ব্যবধান করবেন। এক এক খন্দক পাঁচশ বছরের রাস্তা।

যখন ইতিকাফে বসবে, তখন নিজকে মৃত মনে করবে, বিনা আবশ্যক যেমন, জানাজায়, জুমার নামাজের জন্য বের হতে পারে। মসজিদ ব্যতীত ইতিকাফ দুরস্ত নেই। অবশ্য মহিলারা ঘরের নির্দিষ্ট প্রকৌষ্ঠে ইতিকাফ করবে। জামে মসজিদে ইতিকাফ করলে খুবই ভালো। ইতিকাফে চুপ থাকা মাকরুহ। মনে মনে বা মুখে জিকির করা বা কোরআনুল কারিম তেলাওয়াত করা উচিত।

ইতিকাফের শর্তসমূহ : (১) নিয়ত করা (২) রোজা রেখে ইতিকাফ করা (৩) আসরের নামাজের পর ইতিকাফে বসা এবং আসরের নামাজের পর ইতিকাফ ভঙ্গ করা, (৪) ইতিকাফকারী জ্ঞানসম্পন্ন হওয়া, (৫) পাক-পবিত্র নির্জন গৃহে বসা, (৬) জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায় হয়, এমন মসজিদে বসা, (৭) মহিলারা মসজিদে না বসে কোনো পাক-পবিত্র নির্জন গৃহে বসা, (৮) ইতিকাফ অবস্থায় সহবাস হতে বিরত থাকা। মাহে রমজানের শেষ দশকে মসজিদে অবস্থান অর্থাৎ ইতিকাফ এমন একটি ইবাদত যা আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের অপূর্ব সুযোগ এনে দেয়। আর এদিনগুলোতেই রয়েছে লাইলাতুল কদরের মতো মহিমান্বিত রজনী। যার মূল্য বেশি ও অতি উত্তম। এ সম্বন্ধে মহান আল্লাহ কোরআনুল করিমে এরশাদ করেছেন, আমি একে নাজিল করেছি শবেকদরে। শবেকদর সম্বন্ধে আপনি কী জানেন? শবেকদর হলো এক হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। এতে প্রত্যেক কাজের জন্য ফেরেশতাগণ ও রুহ অবতীর্ণ হয়, তাদের পালনকর্তার নির্দেশক্রমে এটা নিরাপত্তা যা ফজরের উদয় পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। (সুরা : কদর- ১-৫)।


বিভাগ : ধর্ম


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

এই বিভাগের আরও