স্নান উৎসব এলেই কদর বাড়ে লাঙ্গলবন্দের

সিটি করেসপন্ডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১০:০৩ পিএম, ১০ এপ্রিল ২০১৯ বুধবার

স্নান উৎসব এলেই কদর বাড়ে লাঙ্গলবন্দের

এক যুগ আগে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মহাতীর্থ স্থান লাঙ্গলবন্দে প্রায় ২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে আমব্রেলা প্রজেক্ট বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তবে সেটি আলোর মুখ দেখেনি। ৪ বছর পূর্বে পদদলিত হয়ে ১০ জনের মৃত্যুর ঘটনায় টনক নড়েছিল সরকারের। পরবর্তীতে সরকার লাঙ্গলবন্দ উন্নয়নে মহাপরিকল্পনা নিলেও গত ৪ বছরে ওই মহাপরিকল্পনার আংশিক বরাদ্দই মিলেছে। সরকারের নেয়া সেই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কার্যক্রম চলছে অনেকটাই ঢিমেতালে। বরং স্নান উৎসব এলেই যেন কদর বাড়ে লাঙ্গলবন্দের।

পাপ মোচনের আশায় নারায়ণগঞ্জে ব্রহ্মপুত্র নদে প্রতিবছর চৈত্রের মাসের শুক্লাষ্টমী তিথিতে স্নান করতে আসেন দেশ বিদেশের সনাতন ধর্মালম্বীদের লাখ লাখ পুন্যার্থী। শুক্রবার ১২ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া স্নানকে ঘিরে প্রস্তুত ব্রহ্মপুত্রের তীর লাঙ্গলবন্দ। পুণ্যার্থীদের বিশ্বাস তিথির নির্দিষ্ট সময়ে ব্রহ্মপুত্র নদে পুণ্যস্নান করলে সব পাপ মোচন হয়ে যায়। ১২ এপ্রিল শুক্রবার সকাল ১১টা ৫মিনিট থেকে পরদিন শনিবার সকাল ৮টা ৫৫মিনিট ২২ সেকেন্ড তিথি।

জানা গেছে, ২০০৭ সালে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে প্রায় ২৮ কোটি টাকা ব্যায়ে নারায়ণগঞ্জের বন্দরের লাঙ্গলবন্দে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ঐতিহাসিক তীর্থস্থান ঘিরে পর্যটন কেন্দ্র নির্মাণ ও ধর্মীয় স্থানের উন্নয়নে আমব্রেলা প্রজেক্ট বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ২০১০ সালে প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পরিতোষ কান্তি সাহাকে আহ্বায়ক ও তারাপদ আচার্যকে সদস্য সচিব করে ১৩ সদস্য বিশিষ্ট এ কমিটি গঠন করা হয়। তৎকালীন জেলা প্রশাসক সামছুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় ঐতিহাসিক লাঙ্গলবন্দকে নিয়ে একটি ডকুমেন্টারি ফিল্ম তৈরীর সিদ্ধান্ত হয়। তবে কমিটি গঠন হলেও প্রকল্পটি আর আলোর মুখ দেখেনি। ওই কমিটির কার্যক্রমও শুধু কাগজে কলমে সীমাবদ্ধ রয়েছে। ২০১২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারী স্নানঘাটগুলোর সামনে ব্রক্ষপুত্র নদের পুনঃখনন কাজের উদ্বোধনকালে তৎকালীন সংসদ সদস্য নাসিম ওসমান জানিয়েছিলেন, লাঙ্গলবন্দ তীর্থস্থান এলাকাকে আর্ন্তজাতিক পর্যটন কেন্দ্রে হিসেবে গড়ে তোলা হবে। আগামী বছর থেকে লাঙ্গলবন্দে আমব্রেলা প্রজেক্টের কাজ শুরু হবে। তবে আমব্রেলা প্রজেক্টের কাজ শুরু না হলেও ২৮ কোটি টাকার বদলে লাঙ্গলবন্দের উন্নয়ন ও সংস্কারে সরকার ১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড কর্তৃক প্রদত্ত এই অর্থে ২শ’ বছরের পুরোনো জরাজীর্ণ ১২টি স্নান ঘাটের ৯ টি সংস্কার, ৩টি পুন:নির্মাণ, প্রতিটি স্নানঘাটে টাইলস্ বসানো, ১২টি স্নানঘাটে মহিলাদের ড্রেসিংরুম, পুণ্যার্থীদের জন্য খাবার পানি সরবরাহ লাইন পুন:স্থাপন ও পাম্প হাউজ, জলাধার, তিলকযাত্রী নিবাস ও শান্তি আশ্রম মেরামত করার কাজ শুরু করে গণপূর্ত নারায়ণগঞ্জ বিভাগ।

এদিকে দীর্ঘ এক যুগেও সেই আমব্রেলা প্রজেক্ট বাস্তবায়ন হয়নি। হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম বৃহৎ তীর্থস্থান লাঙ্গলবন্দের দুইশ বছরের ইতিহাসে গত ২০১৫ সালের ২৭ মার্চ প্রথম কোন বড় ধরনের দুর্ঘটনায় ১০ জনের প্রাণহানি ঘটে। ওই শোকাবহ ঘটনায় সবার মনেই দাগ কাটে। 

এর কিছুদিন পরে নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার লাঙ্গলবন্দে আন্তর্জাতিক মানের পূর্ণাঙ্গ তীর্থস্থান হিসেবে গড়ে তুলতে প্রধানমন্ত্রী বরাবর ৩৫০ কোটি টাকা একটি প্রস্তাবনা পাঠায় নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসন। ৩৫০ কোটি টাকার প্রস্তাবনার মধ্যে রয়েছে ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়কের দক্ষিণ পাশে লাঙ্গলবন্দের প্রবেশ মুখে গাড়ি পার্কিং ব্যবস্থা, ৫০/১০০ ফুটের ৫টি স্নানঘাট, ৩টি যাত্রী নিবাস, তিনটি পুরাতন মন্দির সংস্কার, দুইটি বেইলী ব্রিজের পরিবর্তে প্রশস্ত পাকা ব্রিজ, লাঙ্গলবন্দে প্রবেশে প্রত্যেকটি সংযোগ সড়ক প্রশস্ত, লাঙ্গলবন্দের ৪ কিলোমিটার রাস্তা প্রশস্ত, বিদেশি পূণ্যার্থীদের ১০তলা জন্য ডরমেটোরি নির্মান, মেডিক্যাল ক্যাম্প, ব্রহ্মপুত্র নদ খনন, রাস্তা ও নদের মাঝখানের জায়গায় উভয় পাড়ে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে রাস্তা নির্মাণ ও দৃষ্টি নন্দন টাইস স্থাপন, নদীর দুইপাশে বৈদ্যুতিক স্থাপন ও বাতি সংযোজন সহ প্রয়োজন সকল ব্যবস্থা ওই প্রস্তাবনায় সংযোগ করা হয়েছে।

লাঙ্গলবন্দের সেই মহাপরিকল্পনার কার্যক্রমও চলছে ঢিমেতালে। সর্বশেষ ২০১৮ সালের ১৪ অক্টোবর বিকেল ৪টায় বন্দর উপজেলার মুছাপুর ইউনিয়নের লাঙ্গলবন্দে বিষ্ণুপ্রিয়া ঘাট নির্মাণ কাজের ভিত্তি প্রস্তর উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে ১২০ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজের প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। ওই অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক রাব্বি মিয়া বলেন, সংসদ সদস্য সেলিম ওসমানের সহযোগিতায় সরকার লাঙ্গলবন্দে ১২০০ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছেন। যার মধ্যে ২৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। আজকে লাঙ্গলবন্দে ১২০ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজের উদ্বোধন হচ্ছে। সামনে আরো ১২০ কোটি টাকার নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করা হবে। পর্যায়ক্রমে ১২০০ কোটি টাকার উন্নয়ন হবে লাঙ্গলবন্দে।

এদিকে প্রতি বছর লাঙ্গলবন্দ স্নান উৎসব এলে যেমন প্রশাসনের তোড়জোড় দেখা যায় বছরের বাকী সময়টা তেমন কোন তোড়জোড় দেখা যায়না। যেই ব্রহ্মপুত্র নদকে কেন্দ্র করে মহাতীর্থ লাঙ্গলবন্দ স্নান উৎসবের আয়োজন করা হয় সেই ব্রহ্মপুত্র নদ দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে দখল ও দূষণের কবলে।

১০ এপ্রিল বুধবার সরেজমিনে লাঙ্গলবন্দের ব্রক্ষ্মপুত্র নদ পরিদর্শন করে নদের পানি দুর্গন্ধযুক্ত দেখা গেছে। জেলা প্রশাসন ব্রহ্মপুত্র নদটির রক্ষনাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকলেও স্নান উৎসব শেষ হওয়ার পরে তাদের কোন ধরনের কার্যক্রম দেখা যায়না। ব্রহ্মপুত্র নদ দখল করে ইতিমধ্যে একাধিক বহুতল স্থাপনা গড়ে উঠলেও সে বিষয়ে কোন ধরনের পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি জেলা প্রশাসনকে।


বিভাগ : ধর্ম


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও