মঞ্চ হলেও হয়নি আলোচনা, বিতর্কে হিন্দু নেতারা

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০১:৫৮ পিএম, ১৩ এপ্রিল ২০১৯ শনিবার

মঞ্চ হলেও হয়নি আলোচনা, বিতর্কে হিন্দু নেতারা

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী অন্যতম তীর্থস্থান নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার লাঙ্গলবন্দে ব্রহ্মপুত্র নদের পুণ্যস্নান উৎসব। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাশাপাশি ভারত, নেপাল, ভূটান, শ্রীলংকা সহ বিভিন্ন দেশের সনাতন ধর্মের পুণ্যার্থীরা প্রতিবছর চৈত্রমাসের অষ্টমীতিথিতে স্নান করতে এখানে আসেন। ফলে লাখো ভক্তের মিলনমেলায় পরিণত হয় লাঙ্গলবন্দের পুণ্য স্নান উৎসব। কিন্তু এ উৎসবকে ঘিরে নিজেদের পরিচিতি, অর্থসংগ্রহ, ভোগ বিলাসিতা সহ ব্যক্তি কেন্দ্রীক সুবিধা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন ওই অনুষ্ঠানের আয়োজক কমিটির নেতারা। লাখো ভক্তের সেবায় নিয়োজিত থাকবেন বলে সভা সমাবেশ মতবিনিময় সভা সহ শুরুতে বিভিন্ন কর্মকান্ডে গলা ফাটিয়ে বক্তব্য রাখলেও বাস্তব কর্মকান্ডে দেখা পাওয়া যায় না। আর নেতাদের এ ধরনের কর্মকান্ড চলে আসছে দীর্ঘ কয়েকবছর ধরে। যা দেখা গেছে এবারও। এবার সবচেয়ে বেশী কলংকিত হয়েছে স্নানের সময়ে আলোচনা সভা না হওয়া। বিগত প্রত্যেক বছরেই স্থানীয় এমপি থেকে শুরু করে মন্ত্রীরা এ আলোচনায় আসলেও এবার মঞ্চ নির্মাণ হলেও সভা হয়নি।

১২ এপ্রিল শুক্রবার সকাল ১১টা ৫মিনিটে অষ্টমী তিথি অনুযায়ী লগ্ন শুরু পর থেকে পুণ্যার্থীদের ভীড় জমে স্নান ঘাটগুলোতে। কোন প্রকার অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটলেও ওই সময় থেকে এবং এর আগে থেকেই আয়োজক কমিটির কাউকে দেখা যায়নি কোন ঘাটেই। এমনকি পুলিশ প্রশাসন ও সাংসদের পক্ষ থেকে অফিস করে ডিউটি করার জন্য বলা হলেও তাদের কোন অফিসরুম খুঁজে পাওয়া যায়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, সকালে পুলিশের কর্মকর্তারা স্নান ঘাট পরিদর্শনে যান। নিরাপত্তার বিষয় পর্যবেক্ষণ করেন। স্নান উদযাপন কমিটির নেতাদের সঙ্গে কথা বলবেন কিন্তু তাদের কাউকে তখন খুঁজে পাওয়া যায়নি। অনেকের মোবাইল ছিল বন্ধ। অনেকের মোবাইলে ফোন দিয়ে জানা গেছে তারা ঘুমিয়ে আছেন। আবার কেউ সকালে নয় দুপুরে কিংবা বিকেলে আসবেন। পরে বাধ্য হয়ে এসপি নিজে একই সব কিছু তদারকি করেন এবং সকলকে নির্দেশ দেন শান্তিপূর্ণ ভাবে যেন অনুষ্ঠান সমাপ্ত হয়।

এমপি সেলিম ওসমানের পরিদর্শনের সময়ও শীর্ষ নেতারা পাশে ছিলেন না জানান স্নান ঘাটের অনেক সাধারণ লোকজন। এদিকে শুক্রবার বিকেলে লাঙ্গলবন্দে স্নান করতে গিয়ে এক পুণ্যার্থী অসুস্থ হয়ে মারা যান। কিন্তু এ বিষয়ে নেতাদের তেমন কোন সহযোগিতা পাননি বলে নিহতের পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেন।

জানা গেছে ২০১৫ সালে ব্রীজ ভাঙার গুজব ছড়িয়ে পদদলীত হয়ে পুণ্য স্নানে আসা বিভিন্ন বয়সের ১০জন পুণ্যার্থী মারা যায়। এরপর থেকে কঠোর অবস্থানে রয়েছে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও পুলিশ প্রশাসন। যার ধারাবাহিকতায় এবারও পুণ্যস্নান শুরু হওয়ার আগে থেকেই শক্ত অবস্থানে ছিলেন নারায়ণগঞ্জ পুলিশ। পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ সদস্যদের নিয়ে স্নানের আগেই একাধিকবার লাঙ্গলবন্দের ঘাটগুলো পরিদর্শন করেছেন। দিক নির্দেশনা দিয়েছেন কিভাবে নিরাপত্তায় পুলিশ কাজ করবে। সব কিছু বিবেচনা করে তিন স্তরে নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছে প্রশাসন।

র‌্যাব, পুলিশ, কোস্টগার্ড, ফায়ার সার্ভিস, মেডিকেল টিম, বিদ্যুত বিভাগ, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, ট্রাফিক, গোয়েন্দা বাহিনী সহ অতিরিক্ত হিসেবে বিজিবি প্রস্তুত রাখা হয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সিসি টিভি ক্যামেরা, ওয়াচ টাওয়ার, চেক পোস্ট, সার্বক্ষনিক নিরাপত্তার মাইকিং, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, শৌচাগার, নদীতে নিরাপত্তা বলয়ও তৈরি করা হয়েছে। তবে এতো কিছু যা করা হয়েছে সবই প্রশাসনের পক্ষ থেকে। কিন্তু সেই তুলনায় নেতাকর্মীদের কোন কিছুই চোখে পড়েনি।

পুণ্যার্থীদের সেবায় যেকয়টি সেবা ক্যাম্প করা হয়েছে সেগুলোও বিভিন্ন অঞ্চল ও সংগঠনের পক্ষ থেকে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে সংগঠন ও ব্যক্তি উদ্যোগে করা হয়েছে। আয়োজকদের পক্ষ থেকে ছিল না একটি আশ্রয় কেন্দ্রও। আশ্রয় কেন্দ্র তো দূরের কথা পুণ্য স্নানের জন্যও এসব আয়োজকদের ঘাটে লাইন ধরে স্নান করতে দেখা যায়নি।

এদিকে গত বুধবার পুলিশ সুপারে কার্যালয়ে লাঙ্গলবন্দ স্নান উদযাপন উপলক্ষে আইনশৃঙ্খলা বিষয়ে মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় এমপি সেলিম ওসমান। ওইসময় সেলিম ওসমান উদযাপন কমিটির আয়োজকদের উদ্দেশ্যে বলেন, আজকে সবাই আয়োজকদের মধ্যেই অনেকে উপস্থিত নেই। হাতেগুনা কয়েকজনের চেয়ে সাংবাদিকদের সংখ্যা বেশি আছে। তারপরও যারা আছেন তারা সিনিয়র পর্যায়ে নেতা। তাই বলছি স্নান উদযাপন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ ভাবে পালনের জন্য দুইদিন আগে থেকে পর্যবেক্ষন করবেন এবং রিপোর্ট জমা দিবেন। এছাড়াও স্নানের শুরু থেকে শেষ করে তারপরই সেখান থেকে ফিরবেন।

এমপি সেলিম ওসমানের এ ধরনের নির্দেশ যে আয়োজকদের কেউ কর্ণপাত করেনি তা বুঝা গেছে শুক্রবার সকাল থেকেই। কারণ সকাল থেকেই কমিটির ৩০ সদস্যের বেশীরভাগকেই স্নান ঘাট এলাকায় দেখা যায়নি। বরং বেলা যখন সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়েছে তখনই এসেছেন একদুইজন। কোথায় ছিল বিশুদ্ধ পানি বিতরণ আর কোথায় প্রসাদ বিতরণ। বৃষ্টিতে ভিজে ও নোংরা কাদা পানিতে ভক্তদের যখন দুভোর্গ তখন নেতারা এসেছেন দামী গাড়িতে চড়ে। ঝড় বৃষ্টির জন্য প্যান্ডেল কিংবা নিরাপত্তা বৈষ্টুনী থাকলেও সেবা সংঘের ক্যাম্পগুলো ছাড়া তেমন কোন কিছুই চোখে পড়েনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আয়োজক কমিটির কয়েকজন জানান, সভাপতি ও সেক্রেটারী সহ আয়োজক কমিটির বড় বড় শীর্ষ পদে ধনী লোকেরা দখল করে রেখেছে। যারা মূলত তেমন কোন কাজ করেন না। নিজেদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি পরিচয় জাহির করতে ব্যস্ত থাকেন। আর নিজেদের ব্যক্তিত্ব দেখাতে এসব কমিটির সভাপতি ও সেক্রেটারী সহ শীর্ষপদগুলো দখল করেছেন। আর এসব পদ ভাঙিয়ে নিজেদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রশাসনের সুযোগ সুবিধার পাশাপাশি পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের আস্থা গ্রহণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তারা শীর্ষ পদে থাকলেও এতো বড় অনুষ্ঠানের তাদের নামমাত্র অনুদান করে থাকেন। কিন্তু অনুষ্ঠানের বড় অংশই আসে বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি সহ ব্যক্তিগত অনুদান থেকে।

নেতারা আরো জানান, গুজব ছড়িয়ে নিহতের পর কমিটির মূল্য রহস্য বের হয়। তখনই প্রকাশ প্রায় কমিটির মধ্যে গন্ডগোল। এরপর নতুন করে কমিটি করা হয় যেখানে সভাপতি হয় ব্যবসায়ী সরোজ সাহা ও সেক্রেটারী হয় সুজিত সাহা। আরো একজন ব্যবসায়ী আছেন কার্যকরী সদস্য পদে শংকর সাহা। এছাড়াও আরো কয়েকজন ব্যবসায়ী আছে। এ কমিটিতে এমন নেতা আছেন যাদের বিরুদ্ধে মন্দিরের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও আছে। তেমন একজন হলে মহানগর পূজা উদযাপন কমিটির সেক্রেটারী শিপন সরকার শিখন। এ ব্যবসায়ীরা কমিটিতে এসেছেন তাদের সামজে অবস্থান তৈরির পাশাপাশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সুবিধা জন্য। আর কিছু আছেন উদযাপনের নামে আসা অর্থের সুবিধা নিতে।

নেতারা বলেন, এবছর নিরাপত্তার বিষয় ও শান্তিপূর্ণ ভাবে পালনের সবচেয়ে বড় ভূমিকাই ছিল পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের। এর পুরো কৃতিত্ব যদি পায় তারাই পাবে। এর একটি উদাহরণ হলো বিগত কয়েক বছরের মধ্যে এবারই বিকেলে আলোচনা সভা হয়নি। সভায় প্রধান অতিথি করা হয় এমপি সেলিম ওসমানকে। এজন্য মঞ্চও করা হয়। এ সভা হবে না সেই বিষয়েও প্রশাসনকে কোন কিছু জানানো হয়নি। বিকেলে অনেক অতিথি হলেও নেতাদের কেউ খুঁজে পায়নি। তাদের ফোন করে জানতে হয়েছে আলোচনা সভা হবে না। এ ছিলো তাদের আয়োজন ও কর্মকান্ড। কিন্তু অনুষ্ঠান শেষে এ কৃতিত্ব নিতে আয়োজক কমিটির ওইসব শীর্ষ নেতারাই এগিয়ে থাকবেন।

এবিষয়ে লাঙ্গলবন্দ স্নান উদযাপন কমিটির সভাপতি সরজ সাহা ও সেক্রেটারী সুজিত সাহার মোবাইলে যোগাযোগ করলে তা বন্ধ পাওয়া যায়।


বিভাগ : ধর্ম


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও