দুর্গাপূজায় কুমারীপূজা

তারাপদ আচার্য্য || সাধারণ সম্পাদক, সাধু নাগ মহাশয় আশ্রম, দেওভোগ, নারায়ণগঞ্জ ০৬:২১ পিএম, ৫ অক্টোবর ২০১৯ শনিবার

দুর্গাপূজায় কুমারীপূজা

সনাতন ধর্মের অন্যতম গ্রন্থ বেদ, পুরাণ তন্ত্র ও ভিন্ন ভিন্ন দার্শনিক শাস্ত্রগ্রন্থসমূহে যত প্রকার সাধনা, অনুভব ও অভিজ্ঞতা আছে; হিন্দু ধর্ম তার যুগ-যুগান্তরব্যাপী তত্ত্বান্বেষণের সুমহান ইতিহাসে যত দেব-দেবীর সাধনার প্রবর্তন করেছে দুর্গা পূজায় তার পূর্ণ সমন্বয় ঘটেছে। এই সমন্বিত দুর্গা পূজার অঙ্গপূজারূপে কুমারী পূজা আমাদের কাছে এক গভীর তত্ত্বের দ্বারোদঘাটন করেছে।

শারদীয় দুর্গোৎসবের এক বর্ণাট্য পর্ব কুমারী পূজা। তান্ত্রিকমতে কুমারী পূজা চলে আসছে স্মরণাতীত কাল থেকে। কিন্তু এই পূজার ব্যাপক পরিচিতি সাধারণ মানুষের মধ্যে ছিল না। স্বামী বিবেকানন্দ বেলুড় মঠে কুমারী পূজার আয়োজন করার পর থেকে এই পূজা নিয়ে ভক্তদের জানার আগ্রহ বাড়তে থাকে। পূজার সাংস্কৃতিক আবহ সম্পর্কে যাদের আগ্রহ বেশি তারাও কুমারী পূজা সম্পর্কে হয়ে ওঠে আগ্রহী। বর্তমান বাংলাদেশ, ভারত, ভূটান ও নেপালসহ বিশ্বের কোনো কোনো রামকৃষ্ণ মিশন ও মঠের পূজামনন্ডপগুলোতে কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত হয়।

শাস্ত্রীয় বিধান মতে, এক বছর বয়সী থেকে শুরু করে ষোল বছর বয়সী কুমারীকে দেবীরূপে পূজা করা হয়। এক এক বছরের মেয়েদের এক এক নামে পূজা করার বিধান রয়েছে। যেমন এক বছরের কন্যার নাম সন্ধ্যা, দুই বছরের কন্যার নাম সরস্বতী, তিন বছরের কন্যার নাম ত্রিধামূর্তি, চার বছরের কন্যার নাম কালিকা, পাঁচ বছরের কন্যার নাম সুভাগা, ছয় বছরের কন্যার নাম উমা, সাত বছরের কন্যার নাম মালিনী, আট বছরের কন্যার নাম কুব্জিকা, নয় বছরের কন্যার নাম কালসন্দর্ভা, দশ বছরের কন্যার নাম অপরাজিতা, এগারো বছরের কন্যার নাম রুদ্রাণী, বারো বছরের কন্যার নাম ভৈরবী, তেরো বছরের কন্যার নাম মহালক্ষ্মী, চৌদ্দ বছরের কন্যার নাম পীঠনায়িকা, পনেরো বছরের কন্যার নাম ক্ষেত্রজ্ঞা ও ষোল বছরের কন্যার নাম অম্বিকা।

শারদীয় দুর্গা পূজার অষ্টমী তিথিতে অনুষ্ঠিত হয় কুমারী পূজা। অষ্টমী তিথিতে অষ্টমী পূজা ছাড়াও রাতে অনুষ্ঠিত হয় সন্ধি পূজা। অষ্টমীর শেষ নবমীর শুরু এই সন্ধিক্ষণে অনুষ্ঠিত হয় বলে এ পূজার নাম সন্ধি পূজা। যেসব মন্ডপে কুমারী পূজা হয় সেখানে একই দিনে অনুষ্ঠিত হয় তিনটি পূজা। দিনের বেলা অষ্টমী বিহিত পূজা আর কুমারী পূজা, রাতে সন্ধি পূজা।

পূজার দিন সকালে পূজার জন্য নির্দিষ্ট কুমারীকে স্নান করিয়ে নতুন কাপড় পরানো হয় এবং ফুলের গয়না ও নানাবিধ অলঙ্কারে তাঁকে সাজানো হয়। পা ধুয়ে পরানো হয় আলতা, কপালে এঁকে দেয়া হয় সিঁদুরের তিলক, হাতে দেয়া হয় মনোরম পুস্প। কুমারীকে মন্ডপে সুসজ্জিত আসনে বসিয়ে তাঁর পায়ের কাছে রাখা হয় বেলপাতা, ফুল, জল, নৈবেদ্য ও পূজার নানাবিধ উপাচার। তারপর কুমারীর ধ্যান করতে হয়।

যাগ-যজ্ঞ-হোম সবই কুমারী পূজা ছাড়া সম্পূর্ণ ফলদায়ী নয়। প্রতিমায় দেবীর পূজাতে যে ফল হয়, তর চেয়ে কুমারীতে দেবীর প্রকাশ উপলব্ধি করে তাঁর পূজায় পরিপূর্ণ ফল পাওয়া যায়। কুমারী পূজায় দৈবফল কোটিগুণ লাভ হয়। কুমারী পুষ্প দ্বারা পূজিতা হলে তার ফল পর্বতসমান। যিনি কুমারীকে ভোজন করান তাঁর দ্বারা ত্রিলোকেরই তৃপ্তি হয়। দেবী পুরাণমতে, দেবীর পূজার পর উপযুক্ত উপাচারে কুমারীদের ভোজনে তৃপ্ত করাতে হবে। কুমারী পূজা ছাড়া হোম প্রভৃতি সকল কর্ম পরিপূর্ণ ফললাভ করে না। কুমারী পূজায় সেই ফললাভ অবশ্যই হয়। কুমারীকে ফুল দিলে তার ফল হয় পর্বত সমান, কুমারীকে ভোজন করালে ত্রিলোককে ভোজন করানো হয়।

বৃহদ্ধর্মপুরাণের বর্ণনা অনুযায়ী দেবতাদের স্তবে প্রসন্ন হয়ে দেবী চন্ডিকা কুমারী কন্যারূপে দেবতাদের সামনে দেখা দিয়েছিলেন। দেবীপূরাণে এ বিষয়ে উল্লেখ আছে। দেবী ভগবতী কুমারীরূপেই আখ্যায়িত। তাঁর কুমারীত্ব মানবীভাব বোঝা খুবই কঠিন। কারণ তিনি দেবতাদের তেজ থেকে সৃষ্টি। শিবের ঘরণী হয়েও তিনি কুমারী।

শ্রীরামকৃষ্ণও কুমারীকে ভগবতীর অংশ বলেছেন। শুধু কুমারী নয়, তার শুদ্ধ দৃষ্টিতে সব রমণীই সাক্ষাৎ ভগবতীর অংশ। নিজ পত্মী শ্রীমা সারদাদেবীকে ‘ষোড়শী’ রূপে পূজা করা সেই শুদ্ধভাবেই দ্যোতক। এইভাবে সাধনার শেষে শ্রীরমকৃষ্ণ নিজ পত্মীকে পূজা করে ঘোড়শীরূপিণী জগন্মাতার শ্রীপাদপদ্মে তার সর্ববিধ সাধনার ফল সমর্পণ করেন। শ্রীরামকৃষ্ণ আরও বলতেন, ‘মাতৃভাব বড় শুদ্ধভাব।’ কুমারীর মধ্যে দৈবী ভাবের প্রকাশ দেখা বা তাকে জননী রূপে পূজা করা সেই শুদ্ধসত্ত্বভাবেরই এক সার্থক প্রকাশ।

পন্ডিত যোগেশচন্দ্র বিদ্যানিধি বলেন, যুগাবতার শ্রীরামকৃষ্ণ কুমারীকে ভগবতীর অংশ বলেছেন। শ্রীমা সারদাদেবীকে ষোড়শীরূপে পূজা করা সেই ভাবেরই অংশ এবং এইভাবে সাধনার শেষে শ্রীরামকৃষ্ণ ষোড়শীরূপণী জগন্মাতার শ্রীচরণে তাঁর সর্ববিধ সাধনার ফল সমর্পণ করেন। কুমারী সম্বন্ধে এইসব প্রশস্তির দ্বারা এটাই বোঝা যায়, কুমারী দেবী ভগবতীর অতি সাত্ত্বিক রূপ। জগন্মাতা বিশ্বব্রহ্মান্ডের সৃষ্টিকর্ত্রী হয়েও চিরকুমারী।

কুমারী পূজার দার্শনিক তত্ত্ব হলো নারীতে পরমার্থ দর্শন ও পরমার্থ লাভ। নারী জাতিতে পরমেশ্বরীর মহিমা ও মাধুর্যের উপলব্ধি ভাবুক সাধকের জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা। আর এই অভিজ্ঞতায় রামকৃষ্ণদেব অনন্যতা প্রকাশ করেছেন তাঁর সহধর্মিনী শ্রীমা সারদাদেবীর দেহাবলম্বনে ফলতারিণী কালিকা পূজার নিশীথ ধামে ষোড়শী পূজার অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। এই সাধনার উপলব্ধিতে সাধকের কাছে সমগ্র বিশ্ব নারীমূর্তি পরিগ্রহ করে।


বিভাগ : ধর্ম


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও