ঘুরেনি রথের চাকা, তালাবদ্ধ গেটে প্রণামেই বাসায় ফিরেছে ভক্তরা

স্টাফ করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:১৩ পিএম, ১ জুলাই ২০২০ বুধবার

ঘুরেনি রথের চাকা, তালাবদ্ধ গেটে প্রণামেই বাসায় ফিরেছে ভক্তরা

‘ভক্ত দর্শনার্থীদের পাপ থেকে মুক্ত করতে ও দর্শন দেওয়ার জন্যই প্রতিবছর আষাঢ় মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে মন্দির থেকে রথে করে রাস্তার বের হয়ে আসেন ভগবান জগন্নাথ দেব। তার ঠিক ৮দিন পর একাদশী তিথিতে একইভাবে রথে চড়ে ফিরে আসেন মন্দিরে’। শত শত বছরের এ ধর্মীয় সংস্কৃতি এবার করোনা ভাইরাস বা কোভিড-১৯ এরজন্য রথের চাকা মন্দির থেকেই বের হয়নি। এমনকি ভক্ত দর্শনার্থীরা পর্যন্ত মন্দিরে প্রবেশ করতে পারেনি। তালাবদ্ধ গেইটের বাইরে থেকে প্রনাম করে ফিরেছেন বাসায়।’

১ জুলাই বুধবার বিকেলে সরেজমিনে নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগ লক্ষ্মী নারায়ণগঞ্জ জিউর আখড়া মন্দিরে গিয়ে দেখা গেছে এ দৃশ্য। ভগবান জগন্নাথ দেবের দর্শন না পেয়ে অশ্রু নয়নে ফিরেছেন অনেক ভক্ত দর্শনার্থী।

মন্দিরের পূজারীদের সূত্রে জানা গেছে, ‘প্রতিবছর আষাঢ় মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে রথযাত্রার প্রথম পর্ব আর একাদশী তিথিতে হয় প্রত্যাবর্তন বা ফিরতি রথ। অর্থাৎ রথটি প্রথম দিন যেখান থেকে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়, আটদিন পরে আবার সেখানেই এনে রাখা হয়। একেই বলে উল্টা রথ। বছরের ওইদিনেই মূলত রথে চড়ে ভগবান জগন্নাথদেব, বলরাম ও সুভদ্রা মন্দির থেকে বের হয়। আর ভগবানের এ দর্শনে ও রথের রশি ধরে টান দিলে পাপ মোচন হয় এমনটাই মানেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। ফলে এ দুই পর্বের এ রথযাত্রাকে ঘিরে হাজারো ভক্তের সমাগম হয় মন্দির ও রথযাত্রার রাস্তায়। ভক্ত দর্শনার্থীরা রথের রশি ধরে টেনে একবার নিয়ে যান আবার পরবর্তীতে টেনে মন্দিরে নিয়ে আসেন। তখন রাস্তায় ভক্ত দর্শনার্থীদের জন্য প্রসাধ বিতরণ করা হয়।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, করোনা ভাইরাসের সংক্রামণ রোধে সরকার জনসমাবেশ নিষিদ্ধ করেছেন। এছাড়াও প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হতে নিষেধ করেছেন। যার জন্য রথযাত্রা উৎসব এবার মন্দিরের আঙ্গিনায় পালন করা হয়। তাছাড়া মন্দিরে যাতে জনসমাগম না হয় সেজন্য মন্দিরের প্রবেশের প্রধান ফটকে তালা দিয়ে রাখা হয়। নির্দিষ্ট কয়েকজন ভক্ত ও পূজারী নিয়ে ভেতরে রথযাত্রা উৎসব পালন করা হয়।

সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রতিবছর বিভিন্ন মন্দির থেকে রথ শহরের বঙ্গবন্ধু সড়কে বের হলে আসলেও এবার মন্দিরের গেট থেকে বের হয়নি। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল লক্ষ্মী নারায়ণগঞ্জ জিউর আখঢ়া মন্দিরের রথ, রাম কানাই মন্দিরের রথ, বলদেব জিউর আখঢ়া মন্দিরের রথ ইত্যাদি। এসব মন্দিরের রথ ছিল মন্দিরে ভেতরে। আর বাইরে দাঁড়িয়ে প্রনাম করে চলে এসেছেন অনেক ভক্ত দর্শনার্থী।

শঙ্করী সাহা নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, ‘করোনা ভাইরাসের জন্য এবার প্রথম রথযাত্রাও বের হয়নি। আজ উল্টা রথও বের হলো না। অনেক মানুষ সমাগাম হলে করোনা ভাইরাস ছড়াতে পারে তাই থেকে মানুষকে রক্ষা করার জন্যই এবার মন্দিরের ভিতরে রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়েছে।’

তিনি নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, ‘শত শত বছরে ধরে চলে আসা রীতি এ করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেলো। ভগবানের দর্শন না করে, রথের রশিতে টানা না দিয়ে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে। এটা যে কতটা কষ্টে কাউকে বলে বুঝানো যাবে না। তারপরও ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি যেন এ করোনা ভাইরাস থেকে আমাদের মুক্তি দেয়। আবারও যেন আমরা সবাই মন্দিরে আসতে পারি।’

লক্ষ্মী নারায়ণ জিউর আখড়া মন্দিরের পূজারী দিপঙ্কর চক্রবর্তী নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, ‘করোনা ভাইরাসের কারণে সব কিছু বদলে গিয়েছে। মানুষ যেভাবে ভালো থাকে সেভাবেই সবাইকে চলতে হবে। সরকারের নিয়ম মেনেই এবার মন্দিরের প্রাঙ্গনে নিয়ম করে রথযাত্রা পালন করা হয়েছে। যে কয়েকজন ছিল সবাই মাস্ক ব্যবহার করেছে। সমাজিক দূরত্ব বজায় রাখে সব কিছু পালন করেছে।’

তিনি বলেন, ‘সকলের প্রার্থনা করোনা ভাইরাস থেকে ভগবান জগন্নাথ দেব আমাদের মুক্তি দিক। পৃথিবীর সমগ্র মানব জাতিকে রক্ষা করুক।’

বলদেব জিউর আখড়া শিব মন্দির কমিটির সভাপতি জয় কে রায় চৌধুরী নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, ‘পূজা উদযাপন কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত হয় করোনা ভাইরাসের জন্য কেউ মন্দির থেকে রথযাত্রা বের করবে না। আর মন্দিরেও যাতে জনসমাগম না হয় সেজন্য মন্দিরের গেট তালা দেয়া থাকবে। যার জন্য এবছর এভাবে পালন করতে হয়েছে।’

তিনি নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, ‘ভক্ত দর্শনার্থীদের কাছে আমরা ক্ষমা চেয়েছি। যে আমরা তাদের মন্দিরে প্রবেশ করতে দিতে পারিনি। আর সেটাও করতে হয়েছে সকলের মঙ্গলের জন্যই। সবাই ভগবানের কাছে প্রার্থনা করেছি যাতে এ করোনা ভাইরাস থেকে আমাদের মুক্তি দেয়। আবারও যেন সবাই মন্দিরে আসতে পারে।

প্রসঙ্গত গত ২৫ মার্চ থেকে সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর থেকেই সকল কিছু বন্ধ হয়ে যায়। সেই সঙ্গে বন্ধ হয় নারায়ণগঞ্জে মন্দিরগুলোও। পরবর্তীতে সাধারণ ছুটি তুলে নিলেও ভক্ত দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার জন্য এখনও পর্যন্ত মন্দিরগুলোতে জনসমাগম বন্ধ রয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ে এক থেকে দুই ঘন্টার জন্য মন্দির খুলে দেয়া হয়। তবে তখনও জনসমাগম হতে দেয়া হচ্ছে না।


বিভাগ : ধর্ম


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও