৯ ফাল্গুন ১৪২৪, বৃহস্পতিবার ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ , ৯:১২ পূর্বাহ্ণ

primer_vocational_sm

ভ্যালেন্টাইন স্পেশাল

চন্দন শীলের ভালোবাসার চিঠি


স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৮:৪১ পিএম, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ মঙ্গলবার | আপডেট: ০২:৪১ পিএম, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ মঙ্গলবার


চন্দন শীলের ভালোবাসার চিঠি

‘তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি, আমি একা বাসলেই তো চলবে না, তোমার উত্তরটা প্রয়োজন অপেক্ষায় রইলাম’ চিঠিতে লিখে সুতপা শীল রমাকে যৌবনে এভাবে প্রেম নিবেদনের চিঠি দিয়ে ছিলেন ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি চন্দন শীল। তিনি এখন মহানগর আওয়ামী লীগেরও সহ সভাপতি।

সেই চিঠির উত্তর পেতে তাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে দীর্ঘ দুই বছর। ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি চন্দন শীলকে জন্মদিনের উপহার দিয়ে  প্রেম প্রস্তাবের ‘হ্যা’ সূচক জবাব দেন।

বিশ্ব ভালোবাসা দিবস উপলক্ষ্যে প্রেমে সফল জুটির প্রেম কাহিনী নিয়ে নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম এর বিশেষ আয়োজনে চন্দন শীল একান্ত আলাপচারিতা তার প্রেম রোমাঞ্চকতা তুলে ধরেন।

চন্দন শীলের বাবা রাজেন্দ্র নারায়ণ শীল ছিলেন নারায়ণগঞ্জ জেলার সহকারী পুলিশ সুপার। আর সুতপা শীল রমার বাবা পরেশ গুপ্ত ছিলেন একজন ইঞ্জিনিয়ার। তার থেকেও বড় পরিচিতি পরেশ গুপ্ত ছিলেন  শেরপুর আড়াইআনি স্ট্যাটের জমিদার।  এই দুইজন ছিলেন একে অপরের বন্ধু।

শহরের নতুন পালপাড়া এলাকায় পাশাপাশি থাকতেন উভয় পরিবার। এই সূত্র ধরেই চন্দন রমার পরিচয় পরে  প্রেমের পথ ধরে পালিয়ে বিয়ে। ১৯৭৮ সালে চন্দন শীল এসএসসি পাশ করে ভর্তি হন সরকারী  তোলারাম কলেজে। আর সুপতা শীল রমা এস এস সি পাশ করে ১৯৮১ সালে ভর্তি হন সরকারী মহিলা কলেজে। তোলারাম কলেজে চন্দন শীল শামীম ওসমানের নেতৃত্বে সক্রিয়ভাবে ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত হয়ে পড়ে। আর রমার পরিবারের লোকজন আগে থেকেই ছিল বামপন্থি রাজনীতির সমর্থক।

কলেজে যাওয়া আসার সময় অনেক ছেলেরা রমাকে বিরক্ত করতো। পারিবারিক সুসম্পর্ক এবং এলাকার  ছেলে হিসেবে রমা চন্দন শীলের কাছে এ বিষয় গুলো জানাতো। এক পর্যায়ে চন্দন রমার জন্য ভালোবাসার টান অনুভব করলেও মুখে বলার সাহস করতে পারেনি। ওই সময় তাদের দুইজনের মাঝে গান শোন ও গল্প উপন্যাসের বই পড়ার একটা নেশা ছিল। উভয়ের মাঝে অডিও ক্যাসেট ও বই আদান প্রদান হতো। একবার রমার কাছ থেকে একটি গল্পের বই এনে দীর্ঘ দিন ফেরত দেয়নি চন্দন শীল। রমা বইটির জন্য তাগিদ দিলে চন্দন শীল বইটি ফেরত দিতে রাজি হয়। বইটি ফেরত দেওয়ার সময় চন্দন শীল বইয়ের ভিতর রমাকে প্রেম নিবেদনের একটি চিঠি দেয়। যেখানে লেখা থাকে ‘তোমাকে ভালোবেসে  ফেলেছি, আমি একা বাসলেই চলবে না তোমার উত্তরটা প্রয়োজন, অপেক্ষায় রইলাম’।

চিঠিটি যাতে তার দৃষ্টিতে আসে সেজন্য তিনি চিঠি থাকা বইয়ের ওই অধ্যায়টি আবারও ভালোভাবে পড়ার অনুরোধ জানায়। এর পর থেকে রমার আচরণ গম্ভীর হয়ে যায়। আগের মত বারান্দায় আসে না।  দেখা হলে কথা বলে না। এমন আচরণে ভয় পেয়ে যায় চন্দন শীল। সে যদি পরিবারকে বিষয়টি জানায় তাহলে তার বাবা (রাজেন্দ্র নারায়ণ শীল) আর তাকে আস্ত রাখবে না। এই ভয়ে চন্দন শীল বেশ কয়েকদিন বেশি রাতে বাসায় ফেরে। যাতে করে তাকে কারো প্রশ্নের সম্মুখীন হতে না হয়। এর মধ্যে চন্দন রমার বাসায় টেলিফোন নাম্বারে ফোন করে কথা বলার চেষ্টা করে। আগে অবাধে ফোন দিয়ে রমাকে ডেকে কথা বললেও ওই ঘটনার পর তার নাম মুখে নিতে সাহস হয় না। রমার মা কিংবা বাবার কণ্ঠ শুনলে কথা না বলেই ফোনটা রেখে দিতো।

একমাস পর অনুষ্ঠানের নিমন্ত্রনে রমাদের বাসায় যায় চন্দন শীল। সেখানে তার কাছ থেকে চিঠির উত্তর জানতে চায় সে। চিঠির বিষয়টি  না জানার ভাব করে মুচকি হাসে রমা। হাসিতে স্বস্তি ফিরে প্রেমিক চন্দনের। ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রয়ারী ছিল চন্দন শীলের জন্মদিন। ওই দিন এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে ঢাকায় ছিলেন তিনি। পরের দিন ১৫ ফেব্রুয়ারী রমাকে দেখা যায় কলেজ গেইটের অদূরে এক বান্ধবীর সাথে। তাকে ডেকে হাতে একটি প্যাকেট ধরিয়ে দেয়। সে সাথে সাথে প্যাকেটটি খুলে দেখতে চাইলে রমা পরে খুলে দেখার জন্য বলে। পরে খুলে দেখে জন্মদিনের উপহার। এটা দেয়ার জন্য রমা ১৪  ফেব্রুয়ারী অপেক্ষায় ছিল। এ উপহারের মধ্য দিয়েই আনুষ্ঠানিক ভাবে চন্দন শীলের  প্রেম নিবেদনের উত্তর দেয় রমা।   এরপর তাদের  প্রেম শুধু বারান্দায় দাড়িয়ে চোখের দৃষ্টি বিনিময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এক সময় তাদের এ  প্রেমের সম্পর্ক কলেজের কমিউনিস্ট পার্টির কিছু লোকজন জানতে পারে। ৮৩ সালের শেষে দিকে চন্দন শীল নারায়ণগঞ্জের বাইরে বেড়াতে যায়। কাকতালীয় ভাবে রমাও তখন নারায়ণগঞ্জের বাইরে বেড়াতে যায়। এ সুযোগে কমিউনিস্ট পার্টির কিছু লোক প্রচার চালায় রমা ও চন্দন শীল মিলে পালিয়ে গেছে। কিছুদিন পর চন্দন শীল নারায়ণগঞ্জে ফিরে আসে। তখনও রমা নারায়ণগঞ্জে আসেনি। রমা ছিল শেরপুরে তার বোনের বাড়িতে। তখন রমার মা চন্দন শীলকে ডেকে বাড়িতে নিয়ে যায়। চন্দন শীলকে লোকজনের বলাবলি করার কথা জানতে চাইলে তিনি সম্পর্কের কথা স্বীকার করে।  সেই সাথে তিনি জানিয়ে দেন যদি রমার পরিবার থেকে রমাকে সামলে রাখতে পারে তাহলে চন্দন শীলও আর এগুবে না।

চন্দন শীলের পরিবারে বিষয়টি জানাজানি হলে তাকে শাসন করা হয়। দুই জনের পরিবারই পারিবারিক সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার ভয়ে কঠোর অবস্থান গ্রহন করে। এ পরিস্থিতিতে দুইজনের পরিবারের যাতায়াত কমে যায়। কিন্তু রমা ও চন্দন শীল দুইজনেই তাদের প্রেমের সিদ্ধান্তে অটল ছিল। চন্দন শীলের বাবার চাকুরীর সুবাদে বিভিন্ন জেলায় বদলী হলেও ভাইবোনদের লেখাপড়ার স্বার্থে চন্দন শীলসহ পরিবারের অন্যরা নারায়ণগঞ্জের বাসায়ই থাকতেন। কিন্তু ১৯৮৪ সালে প্রথম চন্দন শীলের উপর রাগ করে তার বাবা তাদের বাসা মিরপুর ১৪ নম্বরের থানা কোয়াটারে নেয়।  তখন প্রেম ও রাজনীতির কারণে চন্দন শীল প্রায়ই পরিবারকে না জানিয়ে নারায়ণগঞ্জে চলে আসতো। তার বাবা রাজেন্দ্র নারায়ণ চন্দন শীলকে রাজনীতিতে বাধা না দিলেও অনেকট অস্বস্তিতে থাকতো। একটা সময় দুই পরিবার নিশ্চিত হয় তাদের আলাদা করা সম্ভব নয়। যদিও পারিবারিক ভাবেও তাদের বিয়ের প্রস্তাব দেয়া সম্ভব ছিল না। একটা সময় চন্দন শীলের বাবার ক্যান্সার ধরা পড়লে একদিন রমা তার পরিবারকে  না জানিয়ে তার অসুস্থ বাবাকে  দেখতে মিরপুরের বাসায় যায়। তখন চন্দন শীলের মা বাবা উভয়েই রমার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ে। শেষে চন্দন শীলের বাবা রমার বাবাকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠাতে প্রস্তুতি নেয়।

প্রস্তাব পাঠানোর আগে ১৯৮৫ সালের ২৬ জানুয়ারী চন্দন শীল রমার সাথে কথা বলে। তখন রমা জানায় এই মুহূর্তে তাদের পরিবারে প্রস্তাব দেওয়া সম্ভব নয়। কমিউনিস্ট পার্টির লোকজন তাদের পরিবারের কোন সদস্য ছাত্রলীগের কর্মীদের সাথে বিয়ে দেয়া যাবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে। রমার জন্য পরিবার ভাল বর খুঁজতে শুরু করেছে ততদিনে। রমা সিদ্ধান্ত নেয় তারা আজই বিয়ে করবে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২৬ জানুয়ারী তারা নারায়ণগঞ্জ  কোর্টে গিয়ে বিয়ে করে। বিয়ে শেষে চন্দন শীল ঢাকা তার এক মাসির বাড়িতে গিয়ে উঠে। তার মাসি ছিল নি:সন্তান এবং চন্দন শীলকে সে নিজের ছেলের মত আদর করতো। পরে বিকেলে চন্দন শীল তার এক বন্ধুর মাধ্যমে মিরপুরে বাসায় খবর পাঠায় এবং তার বড় ভাই রণ শংকরকে বিষয়টি জানাতে বলে।  বড় ভাই শুনে ওই দিন বিকেলেই তাদের নিয়ে ঢাকেশ্বরী কালী মন্দিরে নিয়ে ধর্মীয়ভাবে ধুমধাম করে বিয়ে দেয়। এরপর ৫/৬ দিন তাদের বাড়িতে ফেরা হয়নি। বাড়ির লোকজন জানত না তারা কোথায় আছে।

এদিকে রমার পরিবারের পক্ষ থেকে চন্দন শীলের বাড়িতে খোঁজ নেওয়া হয়। পরে পরিবারের  জেরার মুখে চন্দন শীলের দাদা রণ শংকর চন্দন শীলের বিয়ে ব্যাপারটা জানিয়ে দেয় এবং তাদের বাড়িতে নিয়ে আসলে পরিবারের সবাই তাদের ঘরে তুলে নেয়। কিন্তু রমার পরিবার থেকে রাগ করে থাকে। ৮৫ সালে মার্চ মাসে চন্দন শীল তার বাবাকে চিকিৎসা করাতে কোলকাতা নিয়ে যায়। তখন রমাকে চট্টগ্রামে চন্দন শীলের ছোটদিদির বাড়িতে রেখে যায়।

কোলকাতায় চিকিৎসারত অবস্থায় মারা যায় রাজেন্দ্র নারায়ণ। মৃত্যুর খবর পেয়ে রমাও কোলকাতায় যায়। বাবার শ্রাদ্ধ সহ সকল আনুষ্ঠানিকতা  শেষে জুলাই মাসে বাংলাদেশে আসে চন্দন শীলের পরিবার। দেশে এসে সংসারের দায়িত্ব পর চন্দন শীলে কাধে। এরমধ্যে আর শ্বশুর বাড়ির কোন খবর রাখেনি সে। তবে তার শ্বশুর বাড়ির লোকজন বিভিন্ন মাধ্যমে খবর পাঠাতো রমা যদি বাড়িতে আসে তাহলে সমস্যা নাই। তখন চন্দন শীল অনেকটা জেদ করেই রমাকে তার বাবার বাড়িতে পাঠাতো। কিন্তু রমা যেতে চাইতো না। বাবার বাড়িতে রমাকে বেশ আদর যতœ করা হতো। ১৯৯০ সালে চন্দন শীল ও রমা সংসারে জন্ম নেয় তাদের একমাত্র ছেলে অরজিৎ শীল মন্টি। তখন চন্দন শীলের তিন ভায়রা ভাই এসে তাকে শ্বশুর বাড়িতে নিয়ে যায়। শ্বশুর বাড়ি গিয়ে চন্দন শীল জানতে পারে এতো দিন তার শ্বশুর বাড়ির  লোকজন চন্দন শীলের ভয়ে তাকে আনতে যায়নি।

এতো বছর পর প্রেমের সেই রোমাঞ্চকর মুহূর্তের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে চন্দন শীলের অনুভূতি জানতে চাইলে নিউজ নারায়ণগঞ্জকে তিনি জানান, এতো বছর পর এসে কথাগুলো বলতে ভালোই লাগছে। আমাদের প্রেমে পবিত্রতা ছিল। খারাপ কোন চিন্তা আমাদের মাঝে ছিল না। আমরা সুখী। অনেক চড়াই উৎড়াই পেরিয়ে আজ আমরা এখানে এসেছি। অনেক আর্থিক কষ্ট সহ্য করেছি এরপর ১৬ জুনে নিজের দুটি পা হারিয়েছি। দুজনের মধ্যে বোঝাপড়াটা ভাল ছিল বলে এতদূর আসা সম্ভব হয়েছে।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

স্যোশাল মিডিয়া -এর সর্বশেষ