১২ বৈশাখ ১৪২৫, বুধবার ২৫ এপ্রিল ২০১৮ , ১০:২০ অপরাহ্ণ

Kothareya1150x300

দুই ছাত্রের চুল কাটা নিয়ে তোলপাড়


সিটি করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৯:৫২ পিএম, ২৯ মার্চ ২০১৮ বৃহস্পতিবার | আপডেট: ০৩:৫২ পিএম, ২৯ মার্চ ২০১৮ বৃহস্পতিবার


ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

গত দুই একদিন ধরে স্যোশাল মিডিয়ায় নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজে দুই ছাত্রের চুল কাটা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম হয়েছে। স্যোশাল মিডিয়ায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনার চেয়ে সমালোচনাই বেশি হয়েছে।

চুল কাটার বিষয়টি নিয়ে অনেকেই যুক্তি দিয়েছেন চুল কাটার আগে বাবা-মাকে জানানো হলো না কেন? কিন্তু বাবা-মা প্রতিদিনই তার ছেলের চুল বড় দেখে আসছিলেন। তাহলে কেন ছেলের চুল কাটা হলো না।

অভিযুক্ত শিক্ষক জানিয়েছেন, ১০ দিন ধরেই বলা হচ্ছে চুল কাটার জন্য। দীর্ঘদিন ধরে বলার পরও যেহেতু চুল কাটছে না, তাই বাধ্য হয়েই ওই শিক্ষক শুধুমাত্র চুল কেটেছেন। অন্য কোন শাস্তি কিংবা বেত্রাঘাতের মতো ঘটনা ঘটেনি।

এছাড়াও অনেকে যুক্তি দিয়েছেন, স্কুল থেকে টিসি বের করে দেয়া জন্য। কিন্তু এক্ষেত্রে শুধুমাত্র চুলের জন্য স্কুল থেকে টিসি দিয়ে বের করে দিবে এটাও তো হতে পারে না।

এই ঘটনায় স্যোশাল মিডিয়ায় একজন স্ট্যাটাসে বলেছেন, আমি নারায়ণগঞ্জ হাই স্কুল এন্ড কলেজের ২০১৬ বর্ষের ছাত্র ছিলাম। সকল শিক্ষক-শিক্ষিকা সম্পর্কেই আমার ধারণা আছে। বিপুল স্যার খুবই ঠান্ডা মনের মানুষ। ক্লাসে কোন শিক্ষার্থীর সাথে তাকে কোনো রকম খারাপ ব্যবহার করতে দেখিনি। তবে উশৃঙ্খলদের শাস্তি দিতেন বটে। তার উপর এমন মিথ্যে আরোপ লাগানো মানে পুরো স্কুলের বদনাম ছড়ানো। এখানে কিছু একটা ভুল আছেই।

তিনি আরো বলেন, হাই স্কুলে চুল বড় রাখা, স্টাইল করা নিষিদ্ধ অনেক আগে থেকেই। আর এটি যুক্তিসংগত কারন বিদ্যালয় লেখাপড়া করার জন্য স্টাইল বা মডেলিং করার জায়গা নয়। আর অভিভাবকদের কথা না হয় বাদই দিলাম তারা নিজেদের বাচ্চাদের শিক্ষা না দিয়ে ক্ষোভ দেখায়। আগে নিজেদের বাচ্চাদের সুশিক্ষা দিন তারপর শিক্ষকদের প্রতি ক্ষোভ দেখানো উচিত। ওই স্ট্যাটাসের সবগুলো কমেন্টেসেও সবাই শিক্ষকের পক্ষে বলেছেন।

ঢাকার একটি নামকরা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে সাজন। হাইস্কুলের চুল কাটা নিয়ে ফেসবুকে তিনি লিখেন, শিক্ষকেরা হলেন জাতি গড়ার কারিগর। তারা ছাত্রদের শাসন করতে না পারেন তাহলে কিভাবে জাতি গড়ে উঠবে। বাবা-মায়ের পরেই শিক্ষকদের স্থান। নবম-দশম শ্রেণীর একটা ছেলে চুল বড় করে স্টাইল করে বেড়াবে আর শিক্ষক শাসন করতে পারবে না, এটা কেমন নিয়ম? যে ছাত্র শিক্ষকের সাথে বেয়াদবি করে সে কোনদিনই মানুষের মতো মানুষ হতে পারে না। এরকম অনেক নজির রয়েছে।

আরেকজন লিখেছেন, ‘‘প্রতিটা অভিভাবক ও সকলকে মনে রাখা উচিত এ দুনিয়াতে বাবা মায়ের পর একমাত্র শিক্ষকই চান তার শিক্ষার্থী অনেক বড় হোক। একমাত্র শিক্ষক চান তার শিক্ষার্থী সকল পরীক্ষায় পাস করুক। দুনিয়াতে আর কেউ চান না তার চেয়ে আর কেউ বড় হোক। শিক্ষকই চান তার ছাত্রটি একদিন অনেক বড় হবে। একটা সময় শিক্ষকদের মারধর ছিল শিক্ষার্থীর জন্য আশীর্বাদ। তখন মানুষ ভাল হতো। আজকে লেখাপড়ায় এতো সুযোগ সুবিধা তবুও অমানুষের অভাব নেই! ইয়াবা ফেন্সিডিল নেশায় সমাজ নিম্নগামী। আমাদের সময় বিনামূল্যে বই ছিল না। বড় ভাই বোন কেউ কেউ চাচা মামাদের বই পড়ে রেখে যাওয়া বইও পড়েছি। দশ বছর পুরনো বইও আমরা পড়েছি। দেখা যেতো বইয়ের প্রথম ও শেষের অধ্যায় ছিল না। তার সঙ্গে বইয়ের দু তিন অধ্যায় সিলেবাসের সঙ্গে মিলতো না। কারষ অনেক পুরোনা বই। শিক্ষক মারধর করলেও চোখের দিকে তাকাতাম না। শিক্ষকের বেত ধরার দঃ:সাহস কারো হতোনা। আমি সোনারগাঁও জি.আর ইনস্টিটিউশনে পড়েছি। সেখানে আমাদের শ্রদ্ধেয় নাসির উদ্দীন মৃধা স্যারের তুলোধনু মাইর খায়নি এমন শিক্ষার্থী কম। এখন কোন শিক্ষার্থীকে শিক্ষক শাসন করতে গিয়ে একটু এদিক সেদিক হলেই শিক্ষকের বারোটা বাজাতে প্রস্তুত হাজারো অভিভাবক। কিন্তু অভিভাবক একবারও চিন্তা করেনা ওই সন্তানকে আরো বেপরোয়া হতে আরো উস্কে দিচ্ছে শিক্ষকের বিরোধীতা করা। ১৫/১৬ বছর পিছনে যান। তখনকার সময় ইন্টারের শিক্ষার্থীদের প্রতি অভিভাবকদের নির্দেশনা ছিল মাগরিবের আযান শেষ হওয়ার সাথে সাথে হাত মুখ ধুয়ে পড়ার টেবিলে বসতে হবে। আর এখন সন্ধা হলে ক্লাস সিক্সের শিক্ষার্থীরা সেজে গুজে স্মার্টফোন হাতে নিয়ে ঘুরতে বের হয়। পুরোই উল্টো। এক সময় বাবা মা সন্তানদের নির্দেশনা দিত কারো সাথে ঝগড়া করবিনা। কেউ ‘শালা’ বললে ভাই বলবি। মাইর খেয়ে বাসায় আসবি কাউকে মাইর দিয়ে নয়। কিন্তু এখন বাবা মা বলেন মাইর খেয়ে যদি বাসায় আসছ তাহলে বাড়িতে তোর ঠাই নাই। মা বাবা বলে দিতেন কোথাও বড়দের সাথে বেয়াদবি করবিনা। বড়দের সালাম দিবি সম্মান করবি কথা শুনবি। আর এখন কোন বাচ্চা পথে ঘাটে খারাপ কিছু করলে কেউ বাধা দিলে উল্টো অভিভাবকরা এসে তাকেই হেনস্তা করে এবং বলে দেয় আমার সন্তান ভুল করলে তোর কি? এক সময় এই সন্তানটির দ্বারা সবচেয়ে অমানসিক আচরণের শিকার হয় অভিভাবকরাই। পরে সন্তান মানুষের মত মানুষ না হলে বলবে আমার ভাগ্য খারাপ। মনে রাখতে হবে যে সন্তান বড়দের বা শিক্ষকদের মান্য করবেনা সে একদিন বাবা মাকেও মান্য করবেনা। এখন শিক্ষকদের সাথে বেয়াদবি করাটাই যেনো কিছু শিক্ষার্থীদের রেওয়াজ। এ কথাগুলো বললাম নারায়ণগঞ্জ হাই স্কুলের একজন হিসাববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক যিনি শিক্ষার্থীদের গাইড ক্লাসটিও দেখেন তিনি বিপুল সরকার। আমার সহপাঠী ও বন্ধু বিপুল সরকার একজন ভদ্র মার্জিত মেধাবী। হিসাববিজ্ঞান বিভাগ থেকে আমরা একই সঙ্গে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেছি। তো সে স্কুলের গাইড ক্লাসে নবম শ্রেণির দুই শিক্ষার্থীকে চুল কেটে ফেলতে দশ দিন ধরে তাগিদ দিয়ে আসছিল। কিন্তু শিক্ষার্থী দুজন বড় বড় কাধ পর্যন্ত চুল রেখেছিল যা কাটতে চায়নি। এক পর্যায়ে মঙ্গলবার বিপুল সরকার কাচি এনে দুজনের তালুর দু মুঠো চুল কেটে দিল যাতে সেলুনে গিয়ে চুল কেটে ফেলে দেয়। বিষয়টি আমি সাপোর্ট করিনা। যদিও সে বলেছে অনেকটা বিরক্ত ও রাগান্বিত হয়ে সে এ কাজটি করেছে। হয়তো সে নিজে দু মুঠো চুল না কেটে দুজনকে সেলুনে নিয়ে গিয়ে বিপুল তার টাকা দিয়ে কাটিয়ে নিয়ে আসতে পারতো। বিষয়টি নিয়ে মঙ্গলবারই প্রধান শিক্ষকের কাছে অভিভাবক অভিযোগ দিলে বিষয়টির সুরহা হয়। পরদিন অভিভাবকেরা গিয়ে আবারও বিষয়টি মাতিয়ে তুলে যা মিডিয়াতেও খবরটি ছড়িয়ে যায়। এখন আমার প্রশ্ন হলো যে অভিভাবকরা বিষয়টি আরো ছড়িয়ে দিল তাতে লাভ কি হলো? আর ওই দুই শিক্ষার্থীর লাভ কি হবে? বরং আমি মনে করি সন্তানেরা ভবিষৎে ভুল কাজ করতে উৎসাহিত হবে। যা ঘটেছিল সেটা নীরবে মাটিচাপা দেয়াটাই সুফল ছিল। আর সন্তান কেন দশ দিনেও গাইড ক্লাসের নিয়ম মানলোনা তাতে তাদেরকেও অভিভাবকরা শাসিয়ে দিতে পারতো। পাশাপাশি প্রধান শিক্ষকের মাধ্যমে বিপুল সরকারকে তিরস্কার করতে পারতো। তাতেই সকলের সুখকর হতো। দুই শিক্ষার্থীর চুল কেটে দিয়েছে এটা দেশব্যাপি জানিয়ে দুই শিক্ষার্থীর আরও ক্ষতি করা হলো।’’

প্রসঙ্গত নারায়ণগঞ্জ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির দুই ছাত্রের চুল কাটা নিয়ে তোলপাড় চলছে। ওই ছাত্রের পরিবারের অভিযোগ, অন্যায়ভাবে শিক্ষক দুইজনের চুল কেটে দিয়েছে যা শোভনীয় না। আর শিক্ষকের দাবী, ১০ দিন ধরে প্রত্যেকদিন বলার পরেও গাইড ক্লাশের শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে দুইজনকে শাসন স্বরূপ শাস্তি দেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, মঙ্গলবার চুল বড় রাখার অভিযোগে নারায়ণগঞ্জ হাই স্কুলের নবম শ্রেণির কাশফি ও শান্ত নামের দুই শিক্ষার্থীকে শারীরিক শাস্তির পাশাপাশি মাথার চুল কেটে দেন স্কুলটির শিক্ষক বিপুল সরকার। এর পরে দুইজন ক্লাস শেষে বাড়ি ফিরে যান।

বুধবার দুপুরে বিষয়টি জানাজানি হয়ে যায়। পরে দুপুরে স্কুলের বাইরে বেশ কয়েকজন অভিভাবক বিক্ষোভ করে।

অভিযুক্ত ওই শিক্ষক বিপুল সরকার জানান, তিনি স্কুলের গাইড ক্লাশটি তদারিক করেন। ওই ক্লাশে মূলত শিক্ষার্থীদের আচরণ, পোশাক, চুল ঠিক রাখার ব্যাপারে নির্দেশনা দেওয়া হয়। গত ১০ দিন ধরেই দুইজন ছাত্রের চুলে ছিল অতি লম্বা ও দৃষ্টিকটু। স্কুলের ছাত্রের এ ধরনের চুল রাখা সমুচিন না। এসব কারণেই দুইজনের চুল ছোট করার নির্দেশ দেওয়া হয়। ১০ দিন ধরেই দুই ছাত্র এ নিয়ে তালবাহনা করছিল। পরে গত রোববার দুইজন জানান যে ২৬ মার্চ ছুটির দিনে কেটে ফেলবে। কিন্তু পরদিন সোমবার ২৭ মার্চও গাইড ক্লাশে দেখা যায় দুইজনের চুল বড়। তখন আমি নিজেই রাগান্বিত হয়ে বাড়তি চুলের কিছু অংশ কেটে দেই যাতে দুই ছাত্রই পরে সেলুনে গিয়ে চুল ছোট করে।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

স্যোশাল মিডিয়া -এর সর্বশেষ