নারায়ণগঞ্জের সাবেক ইউএনওকে ওএসডি, সংসদে ক্ষোভ

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১০:০৩ পিএম, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ সোমবার

নারায়ণগঞ্জের সাবেক ইউএনওকে ওএসডি, সংসদে ক্ষোভ

অন্তঃসত্ত্বার কারণে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হোসনে আরা বেগম বীনাকে ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) করায় সংসদে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এমপিরা। এই ধরনের সিদ্ধান্ত বর্তমান নারী ক্ষমতায়নের যুগে একটি ভুল সিদ্ধান্ত বলেও মন্তব্য করেন তারা। খবর : জাগো নিউজের।

১১ ফেব্রুয়ারী সোমবার জাতীয় সংসদে অনির্ধারণী আলোচনায় অংশ নিয়ে একথা বলেন তারা। এ সময়ে সংসদের সভাপতিত্বে ছিলেন ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া। স্পিকার নিজেও বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

শুরুতেই সাবেক মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি বিষয়টি সংসদে তুলেন। এরপর বক্তব্য রাখেন ওই এলাকার এমপি শামীম ওসমান।

বর্তমান সরকার নারী ক্ষমতার দৃষ্টান্ত উল্লেখ করে চুমকি বলেন, হোসনে আরা বেগম বীনা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছিলেন। তার সহকর্মীরা কাজের প্রশংসা করেছেন।

ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ৯ বছর পর মা হওয়ার আকাংখা একজন নারীর চিরন্তন। সেই শিশুটিকে নিয়ে তার যে মানসিক অবস্থা তা নিশ্চয় আমরা উপলব্ধি করতে পারি। প্রধানমন্ত্রী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা এদেশের উন্নয়নে একটি বিরাট ধাপ অতিক্রম করেছেন নারীর উন্নয়নের মাধ্যমে। সেই লক্ষ্যে তিনি কাজ করে যাচ্ছেন। এজন্য বাংলাদেশে আজ নারী ক্ষমতায়নের মডেল।

নারী উন্নয়ন ও মাতৃত্বকালীন বিভিন্ন সুযোগের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, একজন নির্বাহী কর্মকর্তা, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্বে আছেন তিনি। সে যদি সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে থাকেন তাহলে সন্তান সম্ভবাকে কেন ওএসডি করা হলো? বিষয়টি আমাদের কাছে ক্লিয়ার নয়। তার পাশাপাশি আমি বলতে চাই একজন অন্তঃসত্ত্বা মায়ের সঙ্গে যে আচরণ করতে হয়, আমার মনে হয় সমাজ এখনও তা উপলব্ধি করতে পারেনি।

সন্তান সম্ভাবা নারীদের প্রতি অনেক গুরুত্ব দেয়া উচিত উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিষয়টি স্পর্শকাতর। একজন সন্তান যদি সুস্থভাবে জন্মগ্রহণ না করে তাহলে শুধু মা নয়, আমাদের সমাজ ও দেশের জন্য বার্ডেন হতে পারে। এই ঘটনার জন্য একটি বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি করেন তিনি।

এরপর শামীম ওসমান ওই নারীকে নিজের বোনের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, আমি এই সময় ওমরায় ছিলাম। এই ঘটনার জন্য অত্যন্ত দুঃখিত ও লজ্জিত। আমার নির্বাচনী এলাকা হিসেবে সার্টিফায়েড করতে চাই- ওই কর্মকর্তা অত্যন্ত কর্মঠ ও যোগ্য ছিলেন। নির্বাচনের সময় তাকে আমি অন্য জায়গায় বদলি হয়ে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করলেও তিনি রাজি ছিলেন না। বরং কাজ করতে পারলে তিনি ভালো থাকবেন বলে জানান।

তিনি বলেন, এই নারী আমার বোন, স্ত্রী, মা। আজ আমি জনপ্রশাসন মন্ত্রীকে বহুবার ফোন করেছিলাম। হয়তো আমার নম্বরটা তার কাছে নেই বলে তিনি ধরেননি। এই ঘটনা আমার এলাকায় হওয়ায় আমিও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছি। কেন , কীভাবে তাকে ওএসডি করা হল তা জানতে চাই। আমি মানুষ হিসেবে বলছি, আশা করি এ ব্যাপারে জনপ্রশাসন মন্ত্রী সংসদে বক্তব্য দেবেন। তাকে বদলি নয়, কেন ওএসডি করা হল তা তদন্ত করে বের করুন। আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করি তার বাচ্চাটা যেন হায়াত দারাজ করেন। বাচ্চাটা যদি কিছু হয় আমি নিজেকেও ক্ষমা করব না।

এরপর ডেপুটি স্পিকার বলেন, আশা করি, জনপ্রশাসন মন্ত্রী এ ব্যাপারে বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।

এদিকে হোসনে আরা বেগম বীনাকে ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) করার বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী-খবর প্রকাশ করেছে যুগান্তর। ১১ ফেব্রুয়ারী যুগান্তরের অনলাইনে ওই সংবাদ আপলোড হয়। এছাড়া বাংলা ইনসাইডার নামেও আরেকটি অনলাইন পোর্টালে এ সংক্রান্ত খবর আপলোড জয়।

গত কয়েকদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ গণমাধ্যমে বেশ আলোচিত ইউএনও হোসনে আরা বেগম বীনা। দীর্ঘ ৯ বছরের দাম্পত্য জীবনে প্রথম মা হয়েও সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরতে পারছেন না তিনি।

জন্মের দিন থেকেই হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে অপরিপক্ক শিশুটিকে। নিজের নিষ্পাপ সন্তানের কী দোষ ছিল এমন আর্তি জানিয়ে গত ৮ ফেব্রুয়ারি রাতে ফেসবুকে একটি আবেগঘন স্ট্যাটাস দেন ইএনও হোসনে আরা বেগম বীনা।

এরপর প্রশাসনে তোলপাড় শুরু হয়। ১১ ফেব্রুয়ারী সোমবার প্রধানমন্ত্রী জনপ্রশাসন সচিব ফয়েজ আহাম্মদকে বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।

এর আগে রোববার হোসনে আরা বীণাকে টেনশনমুক্তভাবে বিশ্রামে থাকতেই ওএসডি করা হয়েছে বলে জানান জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (এপিডি) শেখ ইউসুফ হারুন।

তিনি যুগান্তরকে বলেছিলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিষয়টি আমরা দেখেছি। সামনে যেহেতু উপজেলা নির্বাচন, মূলত তার ওপর মানসিক চাপ কমাতে এবং টেনশনমুক্তভাবে বিশ্রামে থাকতে পারেন সে জন্য ওএসডি করা হয়েছে। অন্য কোনো কারণ নেই।’

বিষয়টি অনাকাঙ্খিত বলেও মন্তব্য করেন শেখ ইউসুফ হারুন।

হোসনে আরা বীণার ওই স্ট্যাটাসটি হুবহু তুলে ধরা হলো -‘আমি ব্যক্তিগত বিষয়গুলো সাধারণত ফেসবুকে খুব একটা শেয়ার করি না। তবে আজ মনে হলো এখন চুপ করে থাকাটাও অন্যায়। তাই আজ আর না, আজ আমি বলবো... আমি হোসনে আরা বেগম, উপজেলা নির্বাহী অফিসার নারায়ণগঞ্জ সদর, মাত্র ৯ মাস পূর্বে আমি এ পদে যোগদান করি।

আমার দীর্ঘ ৯ বছরের দাম্পত্য জীবনে বহু চেষ্টা চিকিৎসার পরও আমরা কোনো সন্তান লাভ করতে পারিনি। কিন্তু পাঁচ মাস পূর্বে আমি জানতে পারি আমি দুই মাসের সন্তানসম্ভবা। এ ঘটনা আমার জীবনে সৃষ্টিকর্তার অপার রহমত ছাড়া আর কিছুই নয়, এ বিশ্বাস আমি প্রতিনিয়ত বুকে ধারণ করেছি। এ বিশ্বাস ও স্বপ্ন বুকে নিয়ে অনাগত সন্তানের আগমনের অপেক্ষায় দিন গুনছিলাম।

উল্লেখ্য আমি আমার বাবুকে পেটে নিয়েই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সহকারী রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করি।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে আমি নারায়ণগঞ্জ-৪ ও নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের আংশিক নির্বাচন অত্যন্ত সফলভাবে সম্পন্ন করি।

একজন নারী কর্মকর্তা হিসেবে অজুহাত, ফাঁকিবাজী এই বিষয়গুলোকে কখনই পুঁজি করিনি। যখন যে পদে কাজ করেছি চেষ্টা করেছি শতভাগ নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে। সন্তানসম্ভবা হয়েও এর কোনো ব্যতিক্রম আমি করিনি।

অথচ আমি সন্তান সম্ভবা হয়েছি শোনার পর থেকেই একজন বিশেষ কর্মকর্তা, যার নাম বলতেও আমার রুচি হচ্ছে না, বিভিন্ন মহলে আমাকে অযোগ্য হিসেবে উপস্থাপন করে আমাকে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা থেকে বদলীর পায়তারা করেই চলেছিল।

আমার সন্তান সম্ভবা হওয়াটাকেই সে বিভিন্ন মহলে আমার সবচেয়ে বড় অযোগ্যতা হিসেবে উপস্থাপন করেছে। অথচ এই সন্তান পেটে নিয়েই আমি অত্যন্ত সফলভাবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সহকারী রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। এতে আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক এপ্রিসিয়েশনও পেয়েছি।

আমার সন্তান প্রসবের সম্ভাব্য তারিখ ছিল এপ্রিলের ২০ তারিখ, তেমন মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই আমি ছিলাম। গত ৪ ফেব্রুয়ারি বিকেলে রেগুলার চেকআপ করতে আমি হাসব্যান্ডসহ স্কয়ার হাসপাতালে আসি। চেকআপ শেষে সন্ধ্যায় আমরা হাসপাতালে অপেক্ষা করছি পরবর্তী পরীক্ষার জন্য, এমন সময় আমার একজন ব্যাচমেট ফোন করে জানায় আমার সদাসয় কর্তৃপক্ষ আমাকে ওএসডি করেছে অর্থাৎ আমাকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ করেছে।

আমার অপরাধ হলো আমি সন্তান সম্ভবা। আর তার চেয়েও বড় কারণ হলো সেই তথাকথিত ক্ষমতাধর কর্মকর্তার উপরের মহল কর্তৃক তদবির।

খবরটা শোনার পর আমি মানসিক চাপ সহ্য করতে পারিনি। আমি অ্যাজমার রোগী। মানসিকচাপে আমার ফুসফুসে ব্লাড সার্কুলেশন অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়, ফলে আমার পেটের সন্তানের অক্সিজেন সাপ্লাই বন্ধ হয়ে যায় এবং হঠাৎ করেই আমার পেটের বাবু নড়াচড়া পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। তাৎক্ষণিক হাসপাতালে ভর্তি করা হলে ডক্টর সেদিন রাতেই সিজার করে বাবু বের করে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন। পরে আমার পরিবারের সবার সিদ্ধান্তে পরদিন সকালে আমার মাত্র ৩১ সপ্তাহ বয়সী প্রি-ম্যাচিউর বেবিকে সিজার করে বের করে ফেলা হয়। এখন সে স্কয়ার হাসপাতালের এনআইসিওতে বেঁচে থাকার জন্য প্রাণপণ যুদ্ধ করে যাচ্ছে।

আমার এই নিষ্পাপ সন্তানটার কী অপরাধ ছিল? নাকি মা হতে চাওয়াটাই আমার সবচেয়ে বড় অপরাধ ছিল আমি জানি না!

তবে জানি একজন সব দেখেন তিনি আমার নিষ্পাপ মাসুম সন্তানের উপর এই জুলুমের বিচার করবেন। এই নিষ্ঠুর অমানবিকতার পৃথিবীতে কোনো কর্তা ব্যক্তিদের কাছে আমি এ অন্যায়ের বিচার চাই না, শুধু আমার সৃষ্টিকর্তাকে বলব তুমি এর বিচার করো!

আর যারা আমাকে একটুও ভালোবাসেন আমার নিষ্পাপ সন্তানটার জন্য দোয়া করবেন। ও সুস্থ হয়ে গেলে কোনো কষ্টের কথাই আমার মনে থাকবে না।’



নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও