বন্ধ হয়েছে থেমে যায়নি ‘নারায়ণগঞ্জস্থান’

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:০৫ পিএম, ৩০ মে ২০১৯ বৃহস্পতিবার

বন্ধ হয়েছে থেমে যায়নি ‘নারায়ণগঞ্জস্থান’

কোন কিছু বন্ধ হয়ে গেলে কিংবা বন্ধ করে দিলেই সব সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায় না। বন্ধ হয়ে গেলেই যে সব কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় এমনটাও নয়। এটাই প্রমাণ করেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক গ্রুপ ‘নারায়ণগঞ্জস্থান’। কিন্তু কেন এমন একটি জনপ্রিয় গ্রুপ বন্ধ হয়ে গেছে সে বিষয়ে সকল ফেসবুক ব্যবহারকারীদের মধ্যে রয়েছে কৌতুহল। গ্রুপটি ফিরছে কিনা কিংবা পরবর্তীতে কি ব্যবস্থা নিয়েছে সে সব বিষয়ে গ্রুপটির এডমিনরা নিউজ নারায়ণগঞ্জ প্রতিবেদকে পরবর্তী পদক্ষেপ ও কর্মকান্ডগুলো সর্ম্পকে জানিয়েছেন।

যে কারণে বন্ধ রয়েছে ‘নারায়ণগঞ্জস্থান’
জাতীয় দৈনিক যুগান্তরের প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, ১৩ মে মধ্যরাত থেকে বাংলাদেশের অসংখ্য জনপ্রিয় ফেসবুক গ্রুপ বন্ধ হয়ে গেছে। আর বন্ধের কারণ হিসেবে ফেসবুক বলছে, তাদের কমিউনিটি গাইডলাইন লঙ্ঘনের অপরাধে এসব গ্রুপ ফেসবুক একাউন্ট ডিজেবল করে দেয়া হয়েছে। আর সে অনুযায়ী নারায়ণগঞ্জের জনপ্রিয় গ্রুপ ‘নারায়ণগঞ্জস্থান’ ডিজেবল হয়েছে।

কেন ফেসবুক গ্রুপ ডিজেবল হচ্ছে এ বিষয়ে যুগন্তরকে নিরাপদ সাইবার স্পেসের জন্য প্রযুক্তিগত সহায়তাদানকারী প্রতিষ্ঠান ক্রাইম রিসার্চ অ্যঅনালাইসিস ফাউন্ডেশনের (ক্রাফ) মহাসজিব কাজী মিনহার মহসিন উদ্দিন বলেন, কমিউনিটি গাইডলাইন অনুসারে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ, ধর্মীয় ইস্যুতে কঠোর হচ্ছে ফেসবুক। গাইডলাইন লঙ্ঘন করার কারণে এসব গ্রুপ চিরস্থায়ী বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, ফেসবুক নীতিমালা অনুযায়ী যেকোনো ধরনের অস্ত্রের ছবি, জঙ্গির ছবি, সন্ত্রাসীর ছবি, ধর্মীয় কোনো গোষ্ঠীকে হেয় করে ফেসবুক পোস্ট দিলে তার আইডি ও গ্রুপ বিপজ্জনক অবস্থায় চলে যাবে।

‘কোনো কোনো পোস্ট দেয়া মাত্রই ফেসবুক তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিচ্ছে। আবার কোনোটা ফেসবুকের কাছে অন্য কেউ রিপোর্ট করলে ব্যবস্থা নিচ্ছে।’

তিনি আরো বলেন, এতদিন ধরে ফেসবুকের এ নীতিমালা তেমন কার্যকর না হলেও সম্প্রতি স্প্যামাররা বিষয়টি বুঝতে পেরে বিভিন্ন ধরনের ছবি তৈরি করে সামাজিক মাধ্যমটির গ্রুপগুলোতে পোস্ট করে অন্য আইডি দিয়ে ফেসবুকের কাছে রিপোর্ট করছে। এই রিপোর্ট করার পর গ্রুপ ও গ্রুপের সকল এডমিনের একাউন্ট ডিজেবল করে দিচ্ছে। 

তথা কথিত দু একটি সম্ভাবনা যাদের নষ্ট হচ্ছে তাদের জন্য সুখবর হচ্ছে- এরকম মানুষেরাই পৃথিবীকে এগিয়ে নিয়ে যায় নতুন যুগের দিকে।

পাকিস্তান, আফগানিস্তান, হিন্দুস্থান বলে বিভ্রান্ত সৃষ্টি
নারায়ণগঞ্জের এ জনপ্রিয় গ্রুপটি কেন ‘নারায়ণগঞ্জস্থান’ রাখা হলো সেটা নিয়ে অনেক বিভ্রান্ত সৃষ্টি হয়। এ গ্রুপটির নাম নারায়ণগঞ্জস্থান হওয়ায় অনেকেই একে পাকিস্তান, আফগানিস্তান, হিন্দুস্থান বলে বিভ্রান্ত সৃষ্টি করতো। তবে এডমিন প্যানেল বলতো এটা কোন দেশ কিংবা জাতির সঙ্গে মিলিয়ে নয় বন্ধুদের পছন্দের নামের তালিকায় শীর্ষ ছিল বলেই এর নাম হয়েছে ‘নারায়ণগঞ্জস্থান’।

বাধা এসেছে, এগিয়ে গেছে ‘স্বৈরাচারী নারায়ণগঞ্জস্থান’
নারায়ণগঞ্জের এ জনপ্রিয় গ্রুপটি কয়েক সপ্তাহ ধরে বন্ধ রয়েছে। ফলে ফেসবুক ব্যবহারকারী নারায়ণঞ্জের বাসিন্দাদের মধ্যে যেমন আক্ষেপ রয়েছে তেমনি অনেকে খুশি হয়েছেন। কেনা গ্রুপটি শুরু থেকে কয়েকজনের সীমাবদ্ধ থাকলেও দিনের পর দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল। আর সেই জন্যই গ্রুপটির গাইডলাইন কঠোর হতে থাকে। এর কারণে বিভিন্ন ব্যক্তি, ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক কিংবা গণমাধ্যম কর্মীদের সঙ্গেও এডমিন প্যানেলের কর্তাদের বাকবিতন্ডা সহ মানোমালিন্য হয়। অনৈকেই নাম দেন ‘স্বৈরাচারী নারায়ণগঞ্জস্থান’।

নাম প্রকাশের অনিচ্ছুক এডমিন প্যানেলের একজন বলেন, শুরু থেকেই গ্রুপটি ছিল বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, গল্প, দুষ্টমী করার জন্য। কিন্তু দিনের পর দিন গ্রুপের সদস্য সংখ্যা বাড়তে থাকায় এর মধ্যে কিন্তু নিয়ম করা হয়। আর নিয়মের জন্য অনেকেরই পোস্ট ডিলেট করে দেয়া হতো। এমনকি অনেকের পোস্টা অ্যাপ্রোবাল দেয়া হতো না। তাছাড়া অনেক সাংবাদিক একই নিউজ একাধিকবার পোস্ট দিতেন সেজন্য তাদের বলা হতো। এর জন্য অনেকের সঙ্গে মনোমালিন্য হয়। বাকবিতন্ডা হয়। অনেকে হুমকিও দিয়েছেন বিভিন্ন ভাবে। অনেকে রাজনৈতিক ভাবে কিংবা ব্যক্তিগত ভাবেও বাধা সৃষ্টি করেছে। কিন্তু আমরা সঠিক পথে ছিলাম এগুলো এড়িয়ে এগিয়ে গেছি। যার ফলে আমাদের গ্রুপের সদস্য সংখ্যা লাখ ছাড়িয়েছে।

বন্ধ হয়েছে কিন্তু থেমে যায়নি ‘নারায়ণগঞ্জস্থান’
নারায়ণগঞ্জস্থান ফেসবুক গ্রুপটি আড্ডা, গল্প কিংবা দুষ্টমীর জন্য যদিও খোলা হয় কিন্তু পরবর্তীতে এটা নারায়ণগঞ্জের সার্বিক বিষয়ে আলোচনা হয়। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জের সমস্যা, নারায়ণগঞ্জবাসীর দূর্ভোগ, নারায়ণগঞ্জ সম্ভাবনা, নারায়ণগঞ্জের ঐতিহ্য, সংস্কৃতিক, রাজনৈতিক নেতা, আলোচিত ব্যক্তি, দর্শনীয় স্থান নিয়ে আলোচনা ও গল্প করা হতো। ছবি তোলে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে সমস্যা, সমাধান ও সহযোগিতার জন্য বলা হতো। নারায়ণগঞ্জবাসীদের মধ্যে একটি বন্ধুত্ব তৈরি পরিকল্পনায় এসব করা হতো। এছাড়াও নারায়ণগঞ্জবাসীর সেবায় সর্বদা চেষ্টা করা হতো।

নারায়ণগঞ্জস্থানের গ্রুপের সব থেকে বড় উদ্যোগ ছিল ঈদ উপলক্ষে ‘ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা’ নামে অসহায় সুবিধা বঞ্চিত মানুষ, শিশুদের পাশে দাঁড়ানো। ঈদ আনন্দকে সকলের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেয়া। আর ২০১১ সাল থেকে সেটা করে আসছিলেন এডমিনরা। যার মধ্যে ছিল গরিব অসহায় এবং এতিমখানায় শিশুদের ঈদের পোশাক দেয়া, গরীব ছাত্রদের মধ্যে শিক্ষা বৃত্তি, কর্মসংস্থানের জন্য অসহায়দের ভ্যানগাড়ি, রিকশাবা সেলাই মেশিন দেয়া সহ বিভিন্ন প্রচেষ্টা।

এর ধারাবাহিকতায় ২০১৯ সালের উদ্যোগ হাতে নিয়েছে নারায়ণগঞ্জস্থান গ্রুপের এডমিনরা। আর গ্রুপ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এ সেবা ও সহযোগিতা মূলক তরুণদের এ ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা কার্যক্রম বন্ধ হয়নি। ইতোমধ্যে কয়েক লাখ টাকা তারা গ্রুপ সদস্যদের কাছ থেকে সংগ্রহ করেছে। আর সেই টাকায় আগামী শনিবার (১ জুন) মদিনাতুল উলুম মাদ্রাসায় ছাত্রদের ও হুজুরদের পাঞ্জাবি দেয়ার মাধ্যমে ক্ষুদ্র প্রচেষ্টার ১ম ধাপের কার্যক্রম শুরু হবে। ৪ জুন সকালে অক্টো অফিস এলাকায় ৬৫ থেকে ৭৫ জন গরীব ছাত্রদের মধ্যে শিক্ষা বৃত্তি দেয়া হবে। এছাড়া চিকিৎসা অনুদান, চারনকে সেলাই মেশিন, কর্মসংস্থানের জন্য ভ্যানগাড়ি ও আরো শিশুদের ঈদ উপহার প্রদান করা হবে।

নারায়ণগঞ্জ গ্রুপের মডারেটর অভিজিৎ সাহা বলেন, গ্রুপ বন্ধ হলেও আমাদের কার্যক্রম ঠিকই চালিয়ে যাচ্ছি। আমাদের ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা কার্যক্রম চলমান আছে। এছাড়াও বিভিন্ন সময় সমস্যা সম্পর্কে সহযোগিতা চাইলে আমরা করে যাচ্ছি। শুধু তাই নয় আমরা নিজেরাও গ্রুপটির বাইরে ব্যক্তিগ্রত একাউন্ট থেকে সহযোগিতা করছি। 

‘নারায়ণগঞ্জস্থান’ ফিরছে পুরনো নামে নতুন ভাবে
কয়েক সপ্তাহ বন্ধ থাকায় যারা খুশি হয়ে পোস্ট দিয়েছিল তাদের মধ্যে দুঃখের সংবাদ নিয়ে এসেছে গ্রুপের এডমিনরা। এডমিন ও সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেই নতুন করে গ্রুপটি শুরু করতে যাচ্ছে তাঁরা। তবে নাম পুরনো থাকালেও নতুন ভাবে আসছে গ্রুপটি এমনি তথ্য দিয়েছেন তাঁরা। 

নারায়ণগঞ্জস্থান গ্রুপের এডমিন এন্ড ক্রিয়েটর আরিফিন রওশন হৃদয় নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, নারায়ণগঞ্জস্থান গ্রুপটি নারায়ণগঞ্জবাসীর কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। গ্রুপটি বন্ধ হওয়ায় এর সদস্যদের পাশাপাশি আমাদের সব থেকে বেশি কষ্ট দেয়। কারণ দীর্ঘ ৮ বছর ধরে আমরা গ্রুপটি চালিয়ে আসছিলাম। তবে বন্ধ হওয়ার পরই আমরা বুঝতে পারছি এটা কতটা মানুষের কাছে প্রিয় ছিল। অনেকেই ফোন দেয়, কেউ ম্যাসেঞ্জারে আবার কেউ সরাসরি জানতে চায় কি হয়েছে। সকলের মধ্যে কৌতুহল কেন বন্ধ হলে? কারা বন্ধ করে দিলো? কিংবা বড় কোন সমস্যা কি না?

তিনি আরো বলেন, মানুষের সেই ভালোবাসা থেকেই সদস্য ও এডমিন সহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে নতুন গ্রুপ করার চিন্তা করছি। তবে সেটার নাম পুরনো নামেই থাকবে। শুধু নতুন ভাবে আসছে। এখানে যেমন আড্ডা গল্প দুষ্টুমীর পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জবাসীর সেবায় সর্বদা সচেষ্ট থাকবে।

রওশন বলেন, গ্রুপটি কেন ডিজেবল করে দিয়েছে সেই বিষয়ে ফেসবুক আমাদের কিছুই জানায়নি। তবে নিয়মতান্ত্রিক ভাবে আমরাও আবেদন করেছি কিন্তু তার কোন জবাব পায়নি। দুই আবেদন করলেও একই ভাবে কোন রিপ্লাই দেয়নি ফেসবুক। তাই কেন এমন হয়েছে সেটা জানা সম্ভব হয়নি। তবে আমরা আশা করছি অতিদ্রুত রিপ্লাই পাবো। কিন্তু সেটা খুলে দেয়ার কিংবা চিরতরে বন্ধ করে দেয়ার সেটা জানি না। আর তাই আমরা নতুন গ্রুপ খোলা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

গ্রুপের সদস্য ও এডমিন সহ পরিচালক সকলের উদ্দেশ্যে বলেন, নারায়ণগঞ্জস্থান গ্রুপ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় একই নামে অনেক নতুন গ্রুপ ইতোমধ্যে খোলা হয়েছে। তাই সেসব গ্রুপের সঙ্গে আমরা কেউ জড়িত নই। আমরা যে নতুন গ্রুপ খোলতে যাচ্ছি সেটা পুরানো যারা পরিচালক, স্বেচ্ছাসেবক সহ কর্মকর্তারা রয়েছে তারাই থাকবেন। তাই বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি। নতুন গ্রুপ খোলার পর সেটা জানিয়ে দেয়া হবে।



নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও