‘আমার পুলিশ আংকেল আছে সবাইকে ধরিয়ে দিবো, বাড়াবাড়ি করোনা’

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৩:৩২ পিএম, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০ রবিবার

‘আমার পুলিশ আংকেল আছে সবাইকে ধরিয়ে দিবো, বাড়াবাড়ি করোনা’

ডিএমপির ওয়ারী বিভাগের সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার ইফতেখারুল ইসলাম তাঁর ফেসবুকে লিখেছেন, ছোট্ট মেয়েটির নাম কায়নাত, ওর সাথে পরিচয়ের কয়েক বছর হলো। নিজের ক্ষুদ্র জীবনে একের পর এক যুদ্ধের মুখোমুখি হচ্ছে কায়নাত ও তাঁর মা! জন্মের পর থেকে সে একের পর এক রোগে আক্রান্ত হতে থাকে। সে পর্যন্ত সব ঠিকই ছিল, কিন্তু যখন কায়নাতের ক্যান্সার ধরা পড়লো তখন থেকেই ওদের মা, মেয়ের পৃথিবীটা নড়বড়ে হয়ে যায়!

তারপর থেকে ছোট্ট এই মেয়েটি একের পর এক কেমোথেরাপি নিয়ে যাচ্ছে। প্রায়শঃই সে মহান আল্লাহ`র সাথে কথা বলে!টেলিফোনে কথা বলতে যেয়ে কায়নাত বলে আমাকে নিওনা আল্লাহ! আমার মায়ের জন্য আমাকে বাঁচিয়ে রেখো। কখনো মায়ের উপর রাগ করে উল্টোটাও বলে!

এত অসুস্থ মেয়েটা মনমত খেতেও পারেনা। কেউ জোর করলে বলে, ‘আমার পুলিশ আংকেল আছে সবাইকে ধরিয়ে দিবো, আমার সাথে বাড়াবাড়ি করোনা।’

ছোট্ট এই মেয়েটার ভিতরে অদ্ভুত এক শক্তি কাজ করে, মনে হয় নিজের মায়ের কাছ থেকে জন্মসূত্রে পাওয়া। কায়নাতের পৃথিবীতে আসার পর থেকেই ওর মায়ের যুদ্ধ চলছে, নিজের সন্তানকে বাঁচানোর যুদ্ধ! এরকম মায়ের সন্তান একজন যোদ্ধা হবে এটাই স্বাভাবিক।

কায়নাত একদিক থেকে সৌভাগ্যবান কারণ ওর জন্য সম্পূর্ণ অচেনা, অজানা কিছু চাচ্চু আছেন। এরকম অনেক কায়নাতের খবর কেউই রাখেনা, রাখা উচিত!

কেমোথেরাপি দিয়ে দিয়ে মেয়েটা যখন খুব দুর্বল ঠিক তখনি খাট থেকে পড়ে যেয়ে চোখে ব্যথা পায় সে! একই সময়ে কায়নাতের পুলিশ চাচুর জন্মদিবসও এগিয়ে আসতে থাকে! পুলিশ চাচুর জন্মদিনে কি উপহার দেবে তা নিয়ে ভাবতে ভাবতে সে পুলিশ চাচুর একটি ছবি খুঁজে পায়! চোখের রক্ত শুকাতে না শুকাতেই সে পুলিশ আংকেলের ছবি নিজে প্রস্তুত করে ফেলে!

জীবনে উপহার কম পাইনি! পার্থিব উপহার অনুপ্রেরণা দিলেও তা জীবনের জন্য কখনোই অপরিহার্য মনে হয়না আমার! কিন্তু এই উপহারকে আমি কোন দাঁড়িপাল্লায় মাপি? এক জীবনে কজন মানুষ এতটা ভালবাসার ছোঁয়া পায়। আবেগী মন বারবার মেয়েটির রোগমুক্তি চায়! কায়নাতকে আমি বলি ‘ইউ আর এ্যা বর্ন ফাইটার, এন্ড ইউ উইল কাম ব্যাক এগেইন এন্ড এগেইন’

কায়নাতের মা ফোন করলেই ভয় জেগে উঠে মনে, কিছু হলো নাতো পিচ্চি মামনীর! মহান আল্লাহ এই পৃথিবীর আলোতে ওকে অনেকদিন বাঁচিয়ে রাখুন- এতটুকুই চাওয়া সকলে কায়নাতকে আপনাদের প্রার্থনায় রাখবেন প্লিজ....

প্রসঙ্গত নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার গোগনগর ইউনিয়নের সৈয়দপুর এলাকায় মেয়ে কায়নাতকে নিয়ে বসবাস করেন রেশমা আফরোজি। মায়ের গর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হয়ে পৃথিবীর আলো দেখলেও নিজের জন্মদাতা পিতাকে দেখার সৌভাগ্য হয়নি শিশু কায়নাতের। কায়নাত যখন তার মায়ের গর্ভে ৫ মাসের তখন একটি সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায় কায়নাতের বাবা জসিম উদ্দিন। মেয়ে বুকে আকড়ে ধরে বেঁচে আছেন মা রেশমা আফরোজি। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। গর্ভ থেকেই বিভিন্ন জটিল রোগের সমস্যা নিয়ে জন্মগ্রহন মেয়ে কায়নাত। প্রথম অবস্থায় কায়নাতের এসব সমস্যা সম্পর্কে কিছুই বুঝতে পারেনি মা রেশমা আফরোজি। কায়নাতের বয়স যখন মাত্র ৩ বছর তখন ঘন ঘন জ্বর আসার কারনে তার চিকিৎসা করতে গিয়ে এসব সমস্যার কথা জানতে পারেন তিনি। তখন থেকেই নিজের সর্বস্ব দিয়ে কায়নাতের চিকিৎসা চালিয়ে আসছিলেন।

রেশমা আফরোজি বর্তমানে সৈয়দপুর এলাকায় একটি পরিবার পরিকল্পনা অফিসে চাকরি করছেন। কায়নাতকে লেখাপড়া করানোর জন্য গত বছর সৈয়দপুর এলাকায় একটি কিন্ডার গার্টেন স্কুলে ভর্তি করেছিলেন। কিন্তু স্কুল চলাকালীন সময় কায়নাত জ্ঞান হারিয়ে ফেলায় তাকে আর স্কুলে না পাঠানোর জন্য স্কুলের শিক্ষকেরা কায়নাতের মাকে জানিয়ে দেন। এছাড়াও শারিরীক অসুস্থ্যতার কারনে কায়নাত নিজেও ঠিক মত স্কুলে যেতে পারতেন না। নিজের সর্বস্ব দিয়ে কায়নাতের চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে যখন তার মা হিমশিম খাচ্ছিলো তখন ২০১৭ সালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য সেলিম ওসমানের সাপোর্টার্স ফোরামের পেইজের ইনবক্সে কায়নাতের বেশ কয়েকটি ছবি সহ তার চিকিৎসার জন্য সহযোগীতা চেয়ে এমপি সেলিম ওসমানের কাছে মেয়েকে বাঁচাতে চিকিৎসার সহযোগীতার জন্য আবেদন করেন। তখন সেলিম প্রথমে ৬৫ হাজার ও পরে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকার চেক তুলে দেন।



নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও