নারায়ণগঞ্জের গর্ব ক্ষুদে ফুটবলার নিপুর বেড়ে উঠা কঠিন বাস্তবতায়

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৮:৫৬ পিএম, ১০ জুন ২০১৯ সোমবার

নারায়ণগঞ্জের গর্ব ক্ষুদে ফুটবলার নিপুর বেড়ে উঠা কঠিন বাস্তবতায়

মিডফিল্ডার হিসেবে খেলছেন জাহিদ হাসান নিপু। যাওয়ার কথা ছিল স্পেনে। কিন্তু ভিসা জটিলতার কারণে গত ২৭ মে সেই যাত্রা বাতিল হয়। আর এতে ভেঙে যায় নিপুর স্বপ্ন। তবে নিপুর বেড়ে উঠা এক কঠিন বাস্তবতায়।

জাহিদ হাসান নিপু ইসদাইর এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী খলিলুর রহমান ও গার্মেন্ট ঝুট বাছাইয়ের শ্রমিক আসমা বেগমের ছেলে। চার ভাই ও এক বোনের মধ্যে নিপু তৃতীয়। সে নারায়ণগঞ্জ ফুটবল একাডেমি থেকে এক বছর ধরে ফুটবল খেলার প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। পাশাপাশি সে স্থানীয় ইসদাইর রাবেয়া হোসেন উচ্চ বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ালেখা করেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, ইসদাইরের টিটু মিয়ার কলোনীর টিনের চাল ও বেড়া দিয়ে তৈরি করা হয়েছে অর্ধশত ছোট ছোট খুপড়ি ঘর। একটি চৌকি বসানোর পর হাঁটার তেমন জায়গা নেই। এর মধ্যে গাদাগাদি করে বাবা মা ও ভাই বোনদের সঙ্গে বসবাস করে নিপু। রুমের মধ্যে ফ্যান চললেও প্রচন্ড ভ্যাপসা গরমের মধ্যেই স্পেনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো নিপু। আর ছোট বোন নিপা ও ভাই শফিকুল তাকে সাহায্য করছিল।

জাহিদ হাসান নিপু বলেন, ‘আমাদের এতো টাকা নেই যে বড় কোন ক্লাবে বা একাডেমিতে ভর্তি হয়ে ফুটবল খেলা শিখবো। স্থানীয় কোচ খলিলুর রহমান দুলন স্যারের কাছেই গত এক বছর ধরে খেলা শিখছি। সপ্তাহে শুক্রবার বাদে ৬দিনই আমাদের ফুটবল শেখানো হয়। প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে ১২টা পর্যন্ত স্কুলে শেষে দুপুর আড়াইটা থেকে ৫টা পর্যন্ত ওসমানী পৌর স্টেডিয়ামে স্যারের কাছে ফুটবল শিখি। স্যারের মাধ্যমেই আমি বাছাই পর্বে অংশগ্রহণের সুযোগ পাই। কিন্তু আমি কখনো কল্পনাও করি নাই যে বিদেশ যাওয়ার সুযোগ পাবো। এখন বিদেশের মাটিতেও ভালো খেলে দেশের সুমন অর্জন করতে চাই।’

নিপুর বাবা খলিলুর রহমান বলেন, নিপুর যখন ৬ থেকে ৭ বছর তখন থেকেই ফুটবল খেলার প্রতি আগ্রহ। আমি ছোট ব্যবসা করে খুব কষ্ট করে সংসার চালাই। এর মধ্যে ছেলেকে ফুটবলার বানানোর স্বপ্ন থাকলেও অভাবের কারণে সম্ভব হয়ে উঠছিল না। যার জন্য তেমন বেশি মাঠে যেতে দিতাম না। পড়ালেখায় ভালো হওয়ায় খেলাও বন্ধ করে দিয়ে ছিলাম। এর মধ্যেই বাসা থেকে পালিয়ে প্রতিদিন বিকেলে দুলন স্যারের কাছে গিয়ে ফুটবল শিখতো ও খেলতো। তখন দুলন স্যার এসে বললো যে নিপু ভালো ফুটবল খেলে তাকে খেলতে দাও। আর তাই গত একবছর ধরে ওকে যতটা পারি সহযোগিতা করে যাচ্ছি। কিন্তু এখনও পর্যন্ত খেলার জন্য জুতা, জার্সি, ফুটবল সহ অন্যান্য খেলার সামগ্রী কিছুই কিনে দিতে পারি নাই। কথাগুলো বলতে গিয়ে চোখ দিয়ে জল পড়ছিল তাঁর।

চোখের জল দুই হাত দিয়ে মুছে খালিলুর রহমান বলেন, আমরা গরীব। বড় কোন স্বপ্ন পূরণ করা সম্ভবও না। সে বড় একজন খেলোয়ার হবে এটাই আশা করি। প্রত্যাশা করি দেশের জন্য সম্মান অর্জন করুক। তাহলে আমার সব পাওয়া হবে। আর এসবের জন্য সরকার কিংবা বাফুফের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে এটাই অনুরোধ জানাই।

পাশে দাঁড়িয়ে মা আসমা বেগম বলেন, বড় দুই ছেলে পড়ালেখায় ভালো ছিল না তাই গার্মেন্ট চাকরি করে। কিন্তু নিপু পড়ালেখায় ভালো। প্রাইভেট টিচার রেখে পড়ানোর মতো সামর্থ নেই। তারপরও স্কুলে রোল ১৩ হয়েছে। এখন ছেলে চায় ফুটবলার হতে তাই আমিও চাই ছেলে স্বপ্ন পূরণ হোক।’

নারায়ণগঞ্জ ফুটবল একাডেমীর কোচ খলিলুর রহমান দোলন বলেন, নিপু সুবিধা বঞ্চিত অসহায় পরিবারের ছেলে। টাকা দিয়ে খেলা শেখার ক্ষমতা তার কিংবা তার পরিবারের নেই। কিন্তু ভালো খেলে। ওর পরিবার খেলার প্রতি তেমন আগ্রহ ছিল না বলে নিপুর খেলা বন্ধ করে দেয়। তখন আমি নিজেই তাকে বাসা বলে একাডেমীতে নিয়ে আসি। এখন নিয়মিত খেলাধুলা করে। আর ভালো খেলার কারণেই সুযোগ পেয়েছি নিপু। তাছাড়া নিপুর নেতৃত্বেই আমাদের ফুটবল দল এবারই প্রথম জেলা ক্রীড়া সংস্থা ও ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন এবং জেলা শিশু কিশোর ক্রীড়া ঐক্যজোটের আয়োজিত অনুর্ধ্ব ১৩ কিশোর ফুটবল টুর্নামেন্টে ফাইনালে উঠেছে। আশা করছি ভবিষ্যতে আরো ভালো করবে।

ইসদাইর রাবেয়া হোসেন উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও ইসদাইর সমাজ উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, নিপু শুধু আমাদের স্কুল কিংবা নারায়ণগঞ্জের জন্য নয় বাংলাদেশের গর্ব। এ মাধ্যমে অন্য শিশুদের মধ্যেও খেলাধুলা আগ্রহ বাড়বে।

তিনি আরো বলেন, অত্যন্ত গরীব পরিবারের সন্তান নিপু। ওরা এক সময় বস্তিতে বসবাস করতো। বস্তি ভেঙে দেওয়ার পর থেকে টিনের ঘরে বসবাস করছে। স্কুলের বেতন ও পরীক্ষার ফিস দিতে পারে না। কিন্তু মেধাবী ও ভদ্র ছেলে। তাই পড়ালেখার খরচ স্কুল বহন করে। আর ভালো সুযোগ সুবিধা পেলে এরাই একদিন দেশের জন্য বিশ্বকাপ জিতে আনবে। তাই সরকারের কাছে অনুরোধ প্রতি সুদৃষ্টি দেয়া হোক। কোন ভাবে যেন ওরা ঝড়ে না পরে।


বিভাগ : খেলাধুলা


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও